পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অপরাধ দমনের নামে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক রোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের নির্দেশে গঠিত হওয়া বিশেষ বাহিনী ‘ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট’ (CCD) এর বিরুদ্ধে উঠেছে গণহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মাত্র ৮ মাসে এই বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯২৪ জন।
জুবাইদা বিবির আর্তনাদ: এক রাতেই উজাড় সাজানো সংসার
ঘটনাটি গত নভেম্বরের। দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর জেলার এক নিভৃত পল্লীতে জুবাইদা বিবির বাড়িতে অতর্কিতে হানা দেয় সিসিডির একটি সশস্ত্র দল। অভিযোগ রয়েছে, ঘরে ঢুকে তারা কেবল মূল্যবান সম্পদ, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারই লুট করেনি, বরং তুলে নিয়ে যায় জুবাইদার তিন ছেলে এবং দুই জামাতাকে। জুবাইদা বিবি বলেন, “তারা ঝড়ের বেগে আমাদের বাড়িতে ঢোকে। আমাদের সবকিছু কেড়ে নেওয়ার পর ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে যায়। আমরা তাদের পেছনে পেছনে লাহোর পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলাম, কিন্তু সন্তানদের আর জীবিত ফেরত পাইনি।”
নিহত তিন ভাই ইমরান (২৫), ইরফান (২৩) এবং আদনান (১৮) কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন তাদের বাবা আব্দুল জব্বার। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার ছেলেরা ছিল দিনমজুর, তাদের কোনো পুলিশ রেকর্ড ছিল না। অথচ তাদের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এনকাউন্টার-এর নামে হত্যা করা হলো।” আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই দম্পতি বিচার চাইতে গেলে পুলিশ তাদের পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেয়, যার ফলে তারা অভিযোগ তুলে নিতে বাধ্য হন।
পরিসংখ্যানে রক্তের দাগ: ৮ মাসে ৬৭০টি ‘এনকাউন্টার’
হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (HRCP) সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে পাঞ্জাব জুড়ে সিসিডি অন্তত ৬৭০টি অভিযান বা ‘এনকাউন্টার’ পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে মোট ৯২৪ জন নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির পরিচালক ফারাহ জিয়া বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি পরিসংখ্যানের তুলনা টেনে বলেন, ২০২৪ সালের পুরো বছরে পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশ মিলিয়ে যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩৪১, সেখানে ২০২৫ সালে মাত্র ৮ মাসেই শুধু পাঞ্জাবে এই সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।
সিসিডি: অপরাধ দমন নাকি রাষ্ট্রীয় ‘সমান্তরাল বাহিনী’?
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ ক্ষমতায় আসার পর প্রদেশকে অপরাধমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিসিডি গঠন করেছিলেন। ‘নিরাপদ পাঞ্জাব’ বা ‘Safe Punjab’ স্লোগান দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে সব আন্তঃজেলা গ্যাং বা দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সাধারণ পুলিশ ধরতে ব্যর্থ হয়, তাদের দমনে এই প্রশিক্ষিত বাহিনী কাজ করবে।
তবে এইচআরসিপির দাবি, বাস্তবে সিসিডি একটি ‘Parallel Police Force’ বা সমান্তরাল পুলিশ বাহিনী হিসেবে কাজ করছে। সরকারি মদতে এই বাহিনীর সদস্যরা কার্যত ‘অঘোষিত দায়মুক্তি’ বা Impunity ভোগ করছে, যার ফলে বিচার প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যার মহোৎসবে মেতেছে তারা। পাকিস্তানের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কন্যা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের ভাতিজি মরিয়ম নওয়াজের শাসনামলে এই পর্যায়ের মানবাধিকার লঙ্ঘন রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
১৯৬০-এর দশক থেকে পাকিস্তানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস থাকলেও বর্তমান মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসিডির এই কার্যক্রম আইনি প্রক্রিয়ার (Due Process) চরম লঙ্ঘন। কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা কেবল দেশের সংবিধানবিরোধী নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও পরিপন্থী।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সিসিডিকে দেওয়া এই অবাধ ক্ষমতা পাঞ্জাবকে একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। যেখানে অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারই এখন প্রশাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।