রমজান আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাস। সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ দীর্ঘ সময় সিয়াম সাধনার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি খোঁজেন। তবে ধূমপানে আসক্ত এক শ্রেণির মানুষের মাঝে দেখা যায় এক ভয়ানক প্রবণতা—ইফতারের ঠিক পরেই সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্যে আসক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাদিন পেট খালি থাকার পর হঠাৎ শরীরে তামাকের বিষ প্রবেশ করালে তা সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
পাকস্থলী ও হজমের চরম বিপর্যয়
ইফতারের পর ধূমপান করলে পাকস্থলীতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তামাকের নিকোটিন (Nicotine) পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (Hydrochloric Acid) ক্ষরণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে গ্যাসট্রাইটিস (Gastritis) বা পাকস্থলীর দেওয়ালে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়। যারা ইফতারের পর ধূমপান করেন, তাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে আলসারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হৃদরোগ ও স্ট্রোকের আকস্মিক ঝুঁকি
সারা দিন রোজা রাখার পর শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া এবং মেটাবলিজম (Metabolism) এক বিশেষ অবস্থায় থাকে। এই অবস্থায় ধূমপান করলে রক্তনালী হঠাৎ সংকুচিত হয়ে যায় এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে কার্বন-মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এই তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হৃদপিণ্ডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যা স্ট্রোক (Stroke) এবং হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack) এর ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ইফতারের পর ভারী খাবারের সঙ্গে ধূমপানের সংমিশ্রণ রক্তচাপকে হুট করে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি
জর্ডান ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্মোকিং সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শ্রেইম এ বিষয়ে এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে, ইফতারের পর অতিরিক্ত ধূমপান ফুসফুস এবং মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রকে (Nervous System) উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলে। তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়া ফুসফুসের বায়ুথলিতে সরাসরি আঘাত হানে, যা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি ডেকে আনে। দীর্ঘ সময় বিশ্রামের পর স্নায়ুতন্ত্র যখন খাবারের মাধ্যমে পুষ্টি গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়, তখন তামাকের নিউরোটক্সিন স্নায়বিক দুর্বলতা তৈরি করে।
আসক্তি বর্জন ও সুস্থ জীবনের সুযোগ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যারা ধূমপানে আসক্ত তাদের জন্য পবিত্র রমজান মাসটি হতে পারে এই বদভ্যাস ত্যাগের শ্রেষ্ঠ সময়। দীর্ঘ ১৫-১৬ ঘণ্টা তামাক ছাড়াই থাকার মানসিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সারাজীবনের জন্য ধূমপান বর্জন করা সম্ভব। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা এবং নিজের শরীরের প্রতি সুবিচার করতে ধূমপান ত্যাগের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা প্রফেশনাল কাউন্সিলিং (Counseling) গ্রহণ করা যেতে পারে।
শারীরিক সুস্থতা ও রোজার আধ্যাত্মিক পবিত্রতা বজায় রাখতে ইফতারের পর ধূমপান থেকে বিরত থাকা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং জীবন রক্ষার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।