এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তুষারঝড়ের (Blizzard) কবলে পড়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। ‘নর-ইস্টার’ (Nor'easter) নামক এই শক্তিশালী শীতকালীন ঝড়ের প্রভাবে হিমাঙ্কিত হয়ে পড়েছে জনজীবন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে একাধিক অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যেই জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করা হয়েছে। তুষারপাতের তীব্রতায় ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার ফ্লাইট। বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক সিটির পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ায় সেখানে কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) আরোপ করেছে নগর কর্তৃপক্ষ।
নর-ইস্টারের ভয়াবহ রূপ: প্রকৃতির তাণ্ডবে পঙ্গু জনজীবন
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (National Weather Service) এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া এই তুষারপাত সোমবার পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ঝড়ের প্রভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং কানাডিয়ান মেরিটাইমসের বিশাল এলাকা কয়েক ফুট বরফের নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টায় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে, যা দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে। উপকূলীয় এলাকায় ঘণ্টায় ৬৫ থেকে ৭০ মাইল বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি
গত ৯ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিউ ইয়র্ক সিটিতে হাই-অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। শহরের মেয়র জোহরান মামদানি রোববার রাত ৯টা থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সব ধরনের যান চলাচলের ওপর পূর্ণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শহরের সমস্ত স্কুল, কলেজ, মহাসড়ক এবং সংযোগকারী সেতুগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। কেবল জরুরি সেবা দানকারী যানবাহন (Emergency Services) চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে তুষারঝড়ের প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও সরকারি দফতরগুলোতে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কার্যক্রম বিলম্বিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উপকূলীয় বিপর্যয়
তুষারঝড়ের প্রভাবে নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া, ডেলাওয়্যার এবং ম্যারিল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক লক্ষ মানুষ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন (Power Outage) হয়ে পড়েছেন। তীব্র বাতাস ও বরফের ভারে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। ঝড়ের কারণে কয়েক হাজার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন।
বৈশ্বিক চিত্র: চীন ও ইউরোপেও আবহাওয়ার চরম বিপর্যয়
কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, আবহাওয়ার চরম বৈরিতা লক্ষ্য করা গেছে বিশ্বের অন্য প্রান্তেও। চীনের রাজধানী বেইজিংসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তীব্র তুষারপাত ও ধূলিঝড়ের (Dust Storm) কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় রাস্তায় বরফ জমে ব্যাপক যানজট ও দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপের দেশ রোমানিয়াতেও দ্বিতীয় দফা তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাজধানী বুখারেস্টের প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। অন্যদিকে, পোল্যান্ডে দীর্ঘ দুই মাসের তীব্র শীতের পর হঠাৎ উষ্ণতা বাড়ায় ভিস্তুলা নদীর বরফ গলতে শুরু করেছে, যা বড় ধরনের বন্যার (Flood Warning) ঝুঁকি তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে এক চরম অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।