বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চে ফের মুখোমুখি অবস্থানে তেহরান ও ওয়াশিংটন। একদিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ঐতিহাসিক পারমাণবিক সংলাপের প্রস্তুতি, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘সীমিত সামরিক হামলার’ প্রচ্ছন্ন হুমকি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এখন এক চরম অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কূটনৈতিক সমাধানের (Diplomatic Solution) জন্য প্রস্তুত থাকলেও যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর।
আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওয়াশিংটনকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ, এমনকি তা ‘সীমিত আঘাত’ (Limited Strike) হলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করবে তেহরান।
ইসমাইল বাঘাই সরাসরি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জবাবে বলেন, “আগ্রাসন মানে আগ্রাসনই। যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকার প্রয়োগ করে। ইরানও এর ব্যতিক্রম নয় এবং আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।” মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ট্রাম্প সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছেন—এমন মন্তব্যের পরই তেহরানের এই তীব্র প্রতিক্রিয়া এলো।
ট্রাম্পের ‘লিমিটেড স্ট্রাইক’ ও কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ
গত শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নতুন চুক্তিতে না আসে, তবে তিনি দেশটিতে ‘সীমিত হামলার’ কথা ভাবছেন। ট্রাম্পের এই কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ইরান। বরং তারা ওমানের মধ্যস্থতায় ইতিবাচক পথেই হাঁটতে আগ্রহী।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক বার্তায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান পরোক্ষ আলোচনা থেকে ‘উৎসাহব্যঞ্জক ইঙ্গিত’ পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তিনি উল্লেখ করেন, ইরান আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার (Regional Stability) প্রতি দায়বদ্ধ। তবে আগামী বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় নির্ধারিত তৃতীয় দফা আলোচনার আগে কোনো ধরনের সামরিক উসকানি সংলাপের পরিবেশ নষ্ট করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
জেনেভা সংলাপ: আলোচনার টেবিলে কুশনার-আরাঘচি
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য এই হাই-প্রোফাইল আলোচনায় ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের অত্যন্ত প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনার। ওমানের মধ্যস্থতায় গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফা পরোক্ষ আলোচনা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর জেনেভার এই বৈঠককে ‘মেক অর ব্রেক’ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ওমান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা ‘ইতিবাচক অগ্রগতির’ দিকে যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেভা বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি, তবে কুশনারের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে একটি বড় ধরনের কৌশলগত (Strategic) সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।
আঞ্চলিক শান্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সফল পারমাণবিক চুক্তি পুরো অঞ্চলের প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে। একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ধকল কাটিয়ে উঠতে চায় তেহরান, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়িয়েই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ট্রাম্পের অগ্রাধিকার। তবে সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং আলোচনার টেবিল—এই দুই মেরুর অবস্থানে শেষ পর্যন্ত কূটনীতি জয়ী হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
জেনেভার এই বৈঠক কেবল ইরানের পারমাণবিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।