জাপানের ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানা (Ichikawa City Zoo)। সেখানে গেলে বর্তমানে দেখা মিলবে এক অদ্ভুত ও বেদনাবিধুর দৃশ্যের। মাত্র সাত মাস বয়সী এক খুদে বানর ছানা, নাম তার পাঞ্চ (Punch)। তার সঙ্গী বলতে মা নেই, আছে কেবল একটি ওরাংওটাংয়ের নির্জীব খেলনা পুতুল। মাতৃহীন এই শিশু প্রাণীর কাছে এই নির্জীব পুতুলটিই এখন বেঁচে থাকার অবলম্বন, তার পৃথিবী। সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) পাঞ্চের এই করুণ দৃশ্য ভাইরাল হতেই চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না নেটিজেনরা।
মায়ের শূন্যতায় যখন খেলনাই ‘সুরোগেট মাদার’
২০২৫ সালের জুলাই মাসে জন্ম নেওয়া পাঞ্চের জীবন শুরু হয়েছিল এক নিদারুণ বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। জন্মের পরপরই কোনো এক অজানা কারণে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে কৃত্রিম পরিবেশে লালন-পালন শুরু করলেও, প্রাণিকুলে ‘ইমোশনাল বন্ডিং’ (Emotional Bonding) বা আবেগীয় বন্ধন প্রতিস্থাপনের কোনো প্রযুক্তি আজও আবিষ্কৃত হয়নি।
অন্যান্য বানরদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে পাঞ্চ যখন তীব্র একাকিত্ব ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল, ঠিক তখনই চিড়িয়াখানার কর্মীরা তার খাঁচায় দিয়ে যান একটি ওরাংওটাংয়ের পুতুল। অবুঝ পাঞ্চ সেই পুতুলটিকেই তার ‘মা’ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। ঘুমানোর সময় পুতুলটিকে জাপটে ধরা কিংবা ভয় পেলে তার বুকেই মুখ লুকানো—পাঞ্চের এই আচরণ এখন তার মানসিক নিরাপত্তার (Psychological Safety) প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অসহায়ত্ব নিয়ে ব্যবসার বিরুদ্ধে পিয়া জান্নাতুলের ক্ষোভ
পাঞ্চের এই হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য যখন ডিজিটাল দুনিয়ায় এক টুকরো সংবেদনশীলতার জন্ম দিচ্ছে, তখন মুদ্রার উল্টো পিঠটি উন্মোচন করেছেন জনপ্রিয় মডেল, অভিনেত্রী ও বিশিষ্ট আইনজীবী পিয়া জান্নাতুল (Piya Jannatul)। তিনি লক্ষ্য করেছেন, অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড তাদের সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্ট (Social Media Engagement) বাড়ানোর লক্ষ্যে পাঞ্চের এই অসহায়ত্বকে এক ধরণের ‘মার্কেটিং স্ট্যাটেজি’ (Marketing Strategy) হিসেবে ব্যবহার করছে।
নিজের ভেরিফায়েড হ্যান্ডেল থেকে দেওয়া এক বার্তায় পিয়া এই ধরণের ‘ইনসেনসিটিভ মার্কেটিং’ পলিসির বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নিজের ব্যবসায়িক লাভের জন্য একটি অবুঝ প্রাণীর কষ্ট ও আবেগকে পুঁজি করা চরম স্বার্থপরতা ও অনৈতিকতা।
মানবিকতা ও রমজানের শিক্ষা
পবিত্র রমজান মাসের মাহাত্ম্য ও আধ্যাত্মিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পিয়া জান্নাতুল বলেন, "রোজা রেখে আমরা ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করি। ইফতারের আগে পেটের সেই যন্ত্রণা আমাদের সবার মাঝেই সমব্যথা তৈরি করে। কিন্তু রাস্তার অবহেলিত প্রাণীগুলো যারা প্রতিদিন না খেয়ে থাকে, তাদের কষ্ট কি আমরা একবারও ভাবি?"
তিনি সমাজের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, রমজান কেবল নিজের ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, এটি স্রষ্টার অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি মায়া ও দায়বদ্ধতা প্রদর্শনেরও মাস।
পেশাদারিত্ব বনাম মানবিকতা: একটি সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ
পিয়া জান্নাতুলের এই প্রতিবাদ বর্তমান ডিজিটাল মার্কেটিং (Digital Marketing) বিশ্বের এক কালো দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। যেখানে ‘ভাইরাল কন্টেন্ট’-এর খোঁজে ব্র্যান্ডগুলো অনেক সময় নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে। পাঞ্চের মতো একটি অবুঝ প্রাণীর মাতৃহীনতা যেখানে সহমর্মিতার দাবি রাখে, সেখানে তাকে বিজ্ঞাপনের উপজীব্য করা কেবল রুচিহীনতাই নয়, বরং এক প্রকার অমানবিকতাও বটে।
সবশেষে ভক্ত ও অনুসারীদের প্রতি পিয়া জান্নাতুলের উদাত্ত আহ্বান—"দয়া করে একটু মানবিক হই। সম্ভব হলে রাস্তার প্রাণীগুলোকে একটু খাবার দিই, একটু খেয়াল রাখি।" পাঞ্চের মতো অবুঝ প্রাণের নীরব কান্না যেন কেবল স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানুষের হৃদয়ে সত্যিকারের সমবেদনা জাগ্রত করে, এটাই হোক আজকের দিনের বার্তা।