ইউরোপীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে (UEFA Champions League) মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে বর্ণবাদ বিরোধী এক শক্তিশালী বার্তা। বুধবার রাতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে বেনফিকার বিপক্ষে ২-১ গোলের লড়াকু জয়ের পর রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার অরলিয়ে চুয়ামেনি এক বিস্ফোরক মন্তব্যে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্ণবাদের কোনো জায়গা ফুটবল মাঠে নেই। বর্ণবাদী আচরণের দায়ে বেনফিকার আর্জেন্টাইন তরুণ জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির সাময়িক নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ‘সবার জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
প্রেস্তিয়ান্নির নিষেধাজ্ঞা ও উয়েফার কড়া পদক্ষেপ
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে লিসবনে চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম লেগে। অভিযোগ ওঠে, ম্যাচ চলাকালীন এবং গোল উদযাপনের সময় রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিউস জুনিয়রকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী গালিগালাজ করেন বেনফিকার প্রেস্তিয়ান্নি। যদিও প্রেস্তিয়ান্নি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, তবে প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা (UEFA) তাকে এক ম্যাচের জন্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। বেনফিকা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে আপিল (Appeal) করলেও তা নাকচ হয়ে যায়। ফলে মাদ্রিদ সফরে দলের সঙ্গে থাকলেও বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায় পা রাখার অনুমতি পাননি এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড।
‘ফুটবলের চেয়েও বড় বিষয় আছে’—চুয়ামেনি
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে চুয়ামেনি তাঁর সতীর্থের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “ফুটবল তো শুধু একটি খেলা নয়, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আছে। এই ব্যক্তির (প্রেস্তিয়ান্নি) জন্য আজ মাঠে না নামার সিদ্ধান্তটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। এটি কেবল আমাদের জয় নয়, এটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়া প্রতিটি মানুষের জয়।” ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ক্যামেরুনীয় বংশোদ্ভূত এই মিডফিল্ডারের কণ্ঠে ছিল একাধারে কাঠিন্য ও মানবিকতার সুর।
বার্নাব্যুর প্রতিবাদ ও ভিনিসিউসের শৈল্পিক জবাব
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই বার্নাব্যুর গ্যালারি ছিল বর্ণবাদ বিরোধী স্লোগান ও ব্যানারে মুখর। সমর্থকেরা ‘না টু রেসিজম’ (No to Racism) ব্যানার প্রদর্শন করে ভিনিসিউসের প্রতি তাঁদের একাত্মতা প্রকাশ করেন। তবে সবচেয়ে বড় জবাবটি দিয়েছেন ভিনিসিউস নিজেই। ম্যাচের জয়সূচক গোলটি করার পর লিসবনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে কর্নার ফ্ল্যাগের (Corner Flag) পাশে তাঁর চিরচেনা নাচের মুদ্রায় গোল উদযাপন করেন তিনি। ভিনির এই লড়াকু মানসিকতা নিয়ে চুয়ামেনি বলেন, “ভিনিসিউস মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী। সে পুরোপুরি খেলায় মনোযোগী ছিল এবং আবারও প্রমাণ করেছে সে একজন অনন্য ফুটবলার। ওর হাসিমুখ আমাদের তৃপ্তি দেয়।”
ম্যান অফ দ্য ম্যাচ চুয়ামেনির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
মাঠের রাজনীতি এবং নৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি পারফরম্যান্সেও উজ্জ্বল ছিলেন চুয়ামেনি। ম্যাচে সমতা ফেরানো গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করার পাশাপাশি মাঝমাঠের দখল রেখে জিতে নিয়েছেন ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ (Man of the Match) পুরস্কার। চলতি মৌসুমে এটিই তাঁর প্রথম গোল। নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, “আমি সবসময় নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। গোল করতে পারা সবসময়ই বাড়তি আত্মবিশ্বাস (Confidence) দেয়। আমাদের লক্ষ্য এখন নকআউট পর্বে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা।”
চ্যাম্পিয়নস লিগের এই রাতটি রিয়াল মাদ্রিদের জন্য কেবল শেষ ষোলোর পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে রইল।