রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তন উত্তরের শান্ত জনপদ ঠাকুরগাঁও এক সময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে ভিন্ন এক সমীকরণ ফুটে উঠেছে। তিনটি আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও ভোটের অংক বলছে, জামায়াত তাদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, লড়াইটি এবার আর নৌকা-ধানের শীষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল আদর্শিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির পরীক্ষা।
আসনভিত্তিক ভোটের চিত্র ঠাকুরগাঁও-১ (সদর): এই আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার ক্লিন ইমেজ এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৯৭ হাজার ৮১৯ ভোট হলেও জামায়াত প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা নজর কেড়েছে রাজনৈতিক মহলের।
ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী-হরিপুর): সবচেয়ে বেশি নাটকীয়তা দেখা গেছে এই আসনে। এখানে বিএনপির ডা. আব্দুস সালাম ১ লাখ ২১ হাজার ১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হলেও জামায়াত প্রার্থী মো. আব্দুল হাকিম ১ লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ ভোট পেয়ে তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেন। মাত্র ৫ হাজার ৩১০ ভোটের এই ব্যবধান বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির দুর্বলতা ও জামায়াতের উত্থানকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রানীশংকৈল): এই আসনেও বিএনপি প্রার্থী মো. জাহিদুর রহমান ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৯৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান পান ৯১ হাজার ৯৩৪ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৪০ হাজার ৮৬৩ ভোট হলেও জামায়াতের এই ভোটপ্রাপ্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি।
জামায়াতের উত্থানের কারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর কিছু এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতাদের আচরণ ও অরাজকতার অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, জামায়াত তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রেখে জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের শূন্যতায় তৈরি হওয়া ভোটব্যাংকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সমীকরণ নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের এই অভাবনীয় উত্থান ভবিষ্যতে আসন ভাগাভাগি কিংবা স্থানীয় রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। বিএনপির জন্য এই জয় স্বস্তির হলেও জামায়াতের ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন দলটির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল হকের মতে, জামায়াতের এই অবস্থান বিএনপির জন্য ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।