একবিংশ শতাব্দীর এই যান্ত্রিক যুগে মানবিকতা কি তবে অর্থের কাছে পরাজিত? দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার লা পাজ শহরের নিকটস্থ এক মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আবার সামনে নিয়ে এল। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নতুন মুদ্রিত ব্যাংক নোট বহনকারী একটি বিশালাকার সামরিক বিমান মহাসড়কের ওপর আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে এক বিভীষিকাময় চিত্র—মৃতদেহ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নতুন নোট পকেটে ভরতে ব্যস্ত একদল মানুষ।
রক্তাক্ত মহাসড়ক ও হারকিউলিসের পতন বলিভিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্সেলো সালিনাস জানিয়েছেন, ‘হারকিউলিস সি-১৩০’ (Hercules C-130) মডেলের ওই মালবাহী সামরিক বিমানটি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য নতুন মুদ্রিত মুদ্রা বহন করছিল। লা পাজের পার্শ্ববর্তী এল আল্টো বিমানবন্দরে অবতরণের সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে বিমানটি সরাসরি পাশের একটি ব্যস্ত মহাসড়কে আছড়ে পড়ে। বিমানে আগুন ধরে যাওয়ার আগেই তার ডানার আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় মহাসড়কে থাকা অন্তত ১৫টি যাত্রীবাহী যানবাহন। অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর প্রধান পাভেল টোভার নিশ্চিত করেছেন যে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অন্তত ৩০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মানবিকতার চরম বিপর্যয়: টাকা কুড়ানোর দাঙ্গা দুর্ঘটনার পরপরই যখন উদ্ধারকর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করছিলেন, তখন স্থানীয় কিছু মানুষের আচরণে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে প্রশাসন। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানে থাকা নতুন ‘Boliviano’ নোটগুলো মহাসড়ক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একাধিক ফুটেজে দেখা গেছে, রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ বা যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা মানুষদের সাহায্য করার বদলে একদল মানুষ কাড়াকাড়ি করে টাকা সংগ্রহ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে এক পর্যায়ে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়।
অচল টাকার পেছনে উন্মাদনা বিস্ময়কর তথ্য হলো, জনতা যে নোটগুলোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল, সেগুলো আপাতত শুধুই ‘কাগজের টুকরো’। বলিভিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড এসপিনোজা জানিয়েছেন, বিমানটিতে থাকা নোটগুলোতে তখনও পর্যন্ত কোনো ‘Serial Number’ বা ক্রমিক নম্বর বসানো হয়নি। ফলে এই নোটগুলো বর্তমানে কোনো বাজারেই বিনিময়যোগ্য নয়। তিনি আরও জানান, মুদ্রার সুরক্ষার জন্য নোটগুলো লা পাজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তবে মোট কী পরিমাণ অর্থ বিমানে ছিল তা জনস্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি বলিভিয়ার বিমান বাহিনীর জেনারেল সের্জিও লোরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিমানটির ছয়জন ক্রুর মধ্যে চারজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দুইজনকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা বিমানের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন। দুর্ঘটনার পর এল আল্টো বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ‘Black Box’ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে দেশটির সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেবল ১৫টি প্রাণের অবসান ঘটায়নি, বরং বলিভিয়ার মহাসড়কে ছড়িয়ে থাকা রক্তের মাঝে মানুষের লোভের এক কুৎসিত রূপকেও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে।