দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানকে জোরালো সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আফগান সীমান্ত থেকে ধেয়ে আসা হামলার মোকাবিলায় পাকিস্তানের ‘Self-defense’ বা আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেবল কূটনৈতিক সমর্থনই নয়, পাকিস্তানের বর্তমান সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
ওয়াশিংটনের কড়া বার্তা: ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় সরাসরি পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচের সঙ্গে ফোনালাপের পর জানান, তালেবানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে যে প্রাণহানি ঘটেছে, তাতে ওয়াশিংটন গভীরভাবে শোকাহত। হুকার স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, “আমরা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি। তালেবানের উসকানিমূলক হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষায় পাকিস্তানের যে অধিকার রয়েছে, তার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।” কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থান তালেবান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিল।
ট্রাম্পের দরাজ প্রশংসা: শেহবাজ-মুনির জুটিতে মুগ্ধ হোয়াইট হাউস এদিকে ওয়াশিংটনের সাউথ লনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত নিয়ে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করবে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত চমৎকার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, “পাকিস্তানে এখন একজন অসাধারণ প্রধানমন্ত্রী এবং একজন শক্তিশালী জেনারেল আছেন। আমি তাদের দুজনকে অত্যন্ত সম্মান করি। আমার মনে হয়, বর্তমান নেতৃত্বে পাকিস্তান অসাধারণ উন্নতি করছে।” ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত সার্টিফিকেট ইসলামাবাদের জন্য বড় ধরনের ‘Diplomatic Victory’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘অপারেশন গজব লিল হক’: আফগানিস্তানে ধ্বংসযজ্ঞের খতিয়ান আফগান সীমান্তের ওপার থেকে আসা জঙ্গি হামলার জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন গজব লিল হক’ (Operation Gazab Lil Haq) নামে এক বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেছে। ইসলামাবাদের দাবি অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে চালানো এই বিমান ও স্থল হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংস করা হয়েছে তালেবান নিয়ন্ত্রিত ৮৯টি সেনা চৌকি। এছাড়া ১৩৫টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংসের দাবি করেছে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী। পাল্টা হামলায় পাকিস্তানের ভেতরেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
জিরো টলারেন্স বনাম কার্যকর জবাবের হুঁশিয়ারি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার এই সংঘাত এখন চরম উত্তেজনার শিখরে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তালেবান প্রশাসনের যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ ‘Zero Tolerance’ নীতি অনুসরণ করবে। তিনি স্পষ্ট জানান, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের এই আক্রমণকে হালকাভাবে নিচ্ছে না কাবুল। আফগান সেনাপ্রধান ফসিউদ্দিন ফিতরাত ‘টোলো নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের এই হামলার বিরুদ্ধে তারা ‘আরও শক্তিশালী ও কার্যকর জবাব’ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ দুই মুসলিম প্রতিবেশী দেশের এই যুদ্ধাবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বনেতারা। তারা উভয় পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটনের সরাসরি সমর্থন পাওয়ায় পাকিস্তান এখন আফগান ইস্যুতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।