ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত এখন আদালতের কাঠগড়ায়। সরকারের এই পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করেছেন সুপ্রিম কোর্টের ছয়জন আইনজীবী। বুধবার (৪ মার্চ) উচ্চ আদালতে এই আবেদনটি জমা দেওয়া হয়, যা দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন করে আইনি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইনি চ্যালেঞ্জের নেপথ্যে
রিট আবেদনকারী আইনজীবীরা দাবি করেছেন, সিটি করপোরেশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে সরাসরি প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নের সম্মুখীন। রিটে স্থানীয় সরকার সচিব, নির্বাচন কমিশনসহ (EC) সংশ্লিষ্টদের বিবাদী (Respondent) করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের মতে, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নাগরিক সেবা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনের পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে শঙ্কা রয়েছে।
বিতর্কিত সেই নিয়োগ ও প্রজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন (Notification) জারি করা হয়। সেই আদেশে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, খুলনা, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর—এই ছয় সিটি করপোরেশনে ছয়জন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরা হলেন: ১. মো. আব্দুস সালাম (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) ২. মো. শফিকুল ইসলাম খান (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) ৩. নজরুল ইসলাম মঞ্জু (খুলনা সিটি করপোরেশন) ৪. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী (সিলেট সিটি করপোরেশন) ৫. মো. সাখাওয়াত হোসেন খান (নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন) ৬. মো. শওকত হোসেন সরকার (গাজীপুর সিটি করপোরেশন)
অর্ডিন্যান্স ও ক্ষমতার পরিধি
সরকারের জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ (Ordinance 2024)-এর ধারা ২৫ক-এর উপধারা (১) অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী কাউন্সিল বা করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা সরকারের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই প্রশাসকরা মেয়রের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালন করবেন। তারা বিধি মোতাবেক ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আওতায় থাকবেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
প্রশাসক নিয়োগের শুরু থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএনপি সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে গাজীপুর ও খুলনার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
আইনজীবীদের এই রিট আবেদনের পর এখন সবার চোখ উচ্চ আদালতের দিকে। আদালত যদি এই নিয়োগের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ বা রুল (Rule) জারি করে, তবে দেশের প্রধান সিটি করপোরেশনগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের রদবদল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।