বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের তীব্র ওঠানামার মধ্যেও স্বস্তির খবর দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরে এবং আগমনের পথে রয়েছে মোট ১৪টি জ্বালানিবাহী বিশালাকার জাহাজ। বিপুল পরিমাণ এলএনজি, এলপিজি এবং ডিজেল নিয়ে এসব জাহাজের ধারাবাহিক আগমন দেশের ‘Energy Security’ বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার (৮ মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বন্দরের ‘Logistics’ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সাপ্লাই চেইন ও বৈশ্বিক প্রভাব বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আমদানির কৌশলগত উৎসকে। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে আগত অধিকাংশ জ্বালানি জাহাজের উৎস সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। ফলে দূরপাল্লার শিপিং রুটের ঝুঁকি এড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন ‘Supply Chain’ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
জাহাজের পরিসংখ্যান ও কার্গো প্রোফাইল বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে (Outer Anchorage) অবস্থান করছে এবং আসার পথে রয়েছে এমন ১৪টি জাহাজের মধ্যে ৫টি এলএনজি (LNG) এবং ২টি এলপিজি (LPG) বহনকারী জাহাজ। এছাড়া বাকি জাহাজগুলো ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে আসছে। কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও বেশ কিছু জাহাজ পাইপলাইনে রয়েছে। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান জানান, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও ‘Bunkering’ সেবা গতিশীল রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সজাগ রয়েছে।
** অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং ও সমন্বয়** জ্বালানি সংকট এড়াতে এবং দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘Priority Berthing’ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সমন্বয় সভায় উপস্থিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC), নৌপরিবহন অধিদপ্তর, নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন যে, জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে কোনো ধরনের জট ছাড়াই জেটিতে ভেড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের ‘Operational Activity’ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। জ্বালানি মজুত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং শিল্পকারখানা ও নৌ-বাণিজ্যের চাহিদা মেটাতে কোনো ধরনের ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বহির্নোঙরে অবস্থানরত দামী কার্গোবাহী এসব জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীকে বিশেষ টহল জোরদার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়লে তা সামাল দিতে বন্দরের লজিস্টিক সাপোর্ট আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই ক্রান্তিকালে চট্টগ্রাম বন্দরের এমন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরবে।