বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের চিরচেনা অপেশাদার চালচিত্র বদলে দিতে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। জাতীয় পর্যায়ের ৫০০ জন খেলোয়াড়কে সরকারি নিয়মিত বেতন কাঠামোর (Salary Structure) আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। শনিবার (৭ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে দৈনিক দ্য ডেইলি সান আয়োজিত ‘ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের গৌরব যাত্রা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
ক্রীড়াবিদদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা
সাবেক তারকা ফুটবলার ও বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, “একজন অ্যাথলেট যখন দেশের জন্য ঘাম ঝরান, তখন তাঁর ভবিষ্যৎ ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা চাই ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে।”
প্রাথমিক পর্যায়ে ফুটবল ও ক্রিকেটের পাশাপাশি আর্চারি, শুটিং, ভলিবল, বক্সিং, ভারোত্তলন ও টেবিল টেনিসের মতো জনপ্রিয় ইভেন্টগুলোর ৫০০ জন অ্যাথলেটকে এই বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগের ফলে খেলোয়াড়রা কেবল মেডেল জেতার লক্ষ্যেই নয়, বরং একটি সুনিশ্চিত ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন।
নারী অ্যাথলেটদের নিরাপত্তায় ‘বিশেষ সেল’
নারী খেলোয়াড়দের জন্য একটি নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার (Top Priority) হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, নারী অ্যাথলেটদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা দ্রুত সমাধানে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে খুব শীঘ্রই একটি ‘স্পেশাল সেল’ (Special Cell) গঠন করা হবে। ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিষয়টি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই সেল কেবল নিরাপত্তাই নয়, নারী অ্যাথলেটদের সামগ্রিক মানোন্নয়নেও কাজ করবে।
ত্রায়াথলেট মারিয়ার জন্য তাৎক্ষণিক সমাধান
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রথম নারী ট্রায়াথলেট ফেরদৌসী আক্তার মারিয়ার সংগ্রামের কথা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রতিমন্ত্রী। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (NSC) নির্বাহী পরিচালককে মারিয়ার সমস্যার সমাধানে নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এনএসসি থেকে জরুরি সহায়তার পাশাপাশি মারিয়ার জন্য একটি স্থায়ী ‘স্পন্সর’ (Sponsor) নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে, যা আগামীকাল থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা।
তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক
ক্রীড়া সংস্কৃতিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে এবং মেধাবী অ্যাথলেট খুঁজে বের করতে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন আমিনুল হক। তিনি জানান, জাতীয় শিক্ষাক্রমের (National Curriculum) চতুর্থ শ্রেণি থেকেই খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এতে শৈশব থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠবে এবং পেশাদার ক্রীড়াঙ্গনের পাইপলাইন আরও সমৃদ্ধ হবে।
সুশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের স্পোর্টস ফেডারেশনগুলোকে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জয়গান গাইতে হলে অ্যাথলেটদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত জীবনযাত্রার বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ইভেন্টের জাতীয় দলের নারী অ্যাথলেট, ক্রীড়া সংগঠক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সরকারের এই নতুন শিক্ষানীতি ও বেতন কাঠামোর ঘোষণাকে দেশের ক্রীড়া জগতের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ (Game Changer) হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।