রুপালি পর্দায় তাঁর জাদুর ছোঁয়ায় মুগ্ধ হয়েছে বিশ্ববাসী। কিশোর বয়সেই ‘হ্যারি পটার’ হয়ে কোটি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন ড্যানিয়েল র্যাডক্লিফ। কিন্তু পর্দার সেই সাহসী জাদুকরের বাস্তব জীবনটা ছিল যথেষ্ট কণ্টকাকীর্ণ। বিপুল খ্যাতির তীব্র চাপ আর নিজেকে প্রমাণের অন্তহীন তাড়নায় একসময় ডুবে গিয়েছিলেন মাদকাসক্তির অন্ধকারে। তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সেই অন্ধকার জগতকে পেছনে ফেলে ড্যানিয়েল এখন আলোর পথের যাত্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা ও উত্তরণের গল্প শুনিয়েছেন এই হলিউড (Hollywood) সুপারস্টার।
খ্যাতির বিড়ম্বনা ও আসক্তির শুরু ড্যানিয়েলের ভাষায়, বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না। শোবিজ (Showbiz) দুনিয়ার ঝলমলে সাফল্যের পেছনে যে এক চরম মানসিক একাকীত্ব থাকে, তাই তাকে বিপথে ঠেলে দিয়েছিল। ড্যানিয়েল জানান, মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি সিগারেট এবং অ্যালকোহল-এর (Alcohol) প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। দর্শকদের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী থাকায় সবসময় এক ধরনের অদৃশ্য চাপে থাকতেন তিনি। সেই অস্থিরতা কাটাতে এবং নিজেকে ‘কুল’ প্রমাণ করার ভুল চেষ্টায় নেশাকেই বেছে নিয়েছিলেন এই অভিনেতা।
২০১২-র সেই ভয়াবহ ধস ও ফিরে আসা ড্যানিয়েলের নেশা ছাড়ার পথটি মসৃণ ছিল না। ২০১০ সালের দিকে তিনি প্রথম বুঝতে পারেন যে তাঁর শরীরে নানা অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে। তখন সাময়িকভাবে সরে আসার চেষ্টা করলেও ২০১২ সালে আবারও চরমভাবে নেশার জালে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং সেটি তাঁর ক্যারিয়ারের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ড্যানিয়েল বলেন, “২০১২ সালটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। শরীর আর দিচ্ছিল না, কিন্তু আসক্তি আমাকে ছাড়ছিল না। তবে একসময় উপলব্ধি করলাম, এভাবে চললে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলব।”
ফিটনেস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: নতুন এক ড্যানিয়েল অন্ধকার থেকে ফেরার সংকল্প নিয়ে ড্যানিয়েল তাঁর জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনেন। মাদক ও ধূমপান ছাড়ার জন্য তিনি কঠোর ফিটনেস (Fitness) রেজিম অনুসরণ শুরু করেন। জিমের কঠিন পরিশ্রম আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তাকে মানসিক দৃঢ়তা জোগাতে সাহায্য করে। ড্যানিয়েল জানান, বর্তমানে তিনি কেবল অ্যালকোহল বা সিগারেটই নয়, এমনকি অতিরিক্ত কফি (Coffee) পান করাও কমিয়ে দিয়েছেন। শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি এখন এক সুশৃঙ্খল জীবন অতিবাহিত করছেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য সচেতনতা: মানসিক স্বাস্থ্যের ডাক নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ড্যানিয়েল এখন শিশুশিল্পীদের অধিকার ও সুরক্ষায় সরব। হলিউডের সেটে শিশুশিল্পীদের জন্য থেরাপি (Therapy) ও প্রফেশনাল মেন্টাল কাউন্সেলিং-এর (Mental Counseling) গুরুত্ব নিয়ে তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, অল্প বয়সে খ্যাতি পেলে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেখানে পরিবার ও বন্ধুদের সঠিক সমর্থন থাকলে যেকোনো বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব।
ড্যানিয়েল র্যাডক্লিফের এই জীবনযুদ্ধ প্রমাণ করে যে, পর্দার বাইরেও মানুষ হিসেবে জয়ী হওয়া যায়। জাদুর কাঠি দিয়ে নয়, বরং কঠোর সংকল্প আর ইতিবাচক জীবনবোধের মাধ্যমেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় দানবকে পরাজিত করেছেন।