মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তার চিরাচরিত স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এক চাঞ্চল্যকর ও আন্তর্জাতিক মহলে অবিশ্বাস্য দাবি করে বসেছেন। তিনি দাবি করেছেন, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরান নাকি তাকে সে দেশের ‘সর্বোচ্চ নেতা’ বা Supreme Leader হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ওয়াশিংটনের এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে দেওয়া তার এই বক্তব্য বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও বাস্তবতার নিরিখে বেশ নজিরবিহীন।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের ‘বিস্ফোরণ’ স্থানীয় সময় বুধবার (২৫ মার্চ) ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান পার্টির (Republican Party) একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি (Global Geopolitics) নিয়ে কথা বলার সময় এই দাবি করেন। ট্রাম্প জানান, গত মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের প্রভাবশালী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের ভাষায়, "ইরানের নেতৃত্ব অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল যেন আমি তাদের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হই। আমি তাদের সোজাসুজি বলেছি—ধন্যবাদ, আমার এটার কোনো প্রয়োজন নেই।" তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বিশ্বের কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের রাষ্ট্রপ্রধানই এই মুহূর্তে ইরানের দায়িত্ব নিতে চাইবেন না।
খামেনি পরবর্তী ইরান ও ক্ষমতার লড়াই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে এক ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যদিও খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তবুও ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সেখানে পর্দার আড়ালে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। ট্রাম্পের এই দাবি মূলত তেহরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সংকটকে উপহাস করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পর্দার আড়ালে ‘মরিয়া’ চুক্তির চেষ্টা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কেবল প্রস্তাবের দাবি করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি আরও দাবি করেন যে ইরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি বড় চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছে। তিনি বলেন, "তারা একটি চুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, কিন্তু তারা এটি প্রকাশ্যে স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ তারা ভাবছে, এটি জানাজানি হলে তারা তাদের নিজেদের জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়বে। আবার আমাদের শক্তির ভয়েও তারা তটস্থ।"
ইরানের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের হত্যাকাণ্ড ও সামরিক স্থাপনায় হামলার দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, সেখানে বর্তমানে নেতৃত্বের চরম অভাব এবং এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
কূটনৈতিক গুঞ্জন ও বাস্তবতা ট্রাম্পের এই দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হাস্যরসের খোরাক জোগালেও, এটি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শীতল সম্পর্কের উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এনডিটিভি (NDTV) সহ বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের এই বক্তৃতাকে ‘উদ্ভট’ বা ‘অবিশ্বাস্য’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কূটনীতিকদের মতে, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র অন্য দেশের প্রধানকে নিজেদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হওয়ার প্রস্তাব দেবে—এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (International Relations) ইতিহাসে প্রায় অসম্ভব।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তিনি বারবার নিজেকে একজন ‘গ্রেট ডিল মেকার’ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়েই এমন নাটকীয় দাবি করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।