বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞে যোগ দিল শেষ দুই সারথি। উত্তর আমেরিকায় বসতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপের ‘Final 48’ বা মূল পর্বের লাইন-আপ পূর্ণ হলো এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে (Intercontinental Play-off) জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ইরাক ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। দীর্ঘ কয়েক দশকের হাহাকার ঘুচিয়ে এই দুই দেশের বিশ্বমঞ্চে প্রত্যাবর্তন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘Comeback Story’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
৪০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা: মেসোপটেমিয়ার সিংহের গর্জন
বুধবার গুয়াডালপের এস্তাদিও বিবিভিএ স্টেডিয়ামে এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধি বলিভিয়াকে ২-১ গোলে পরাজিত করে ইরাক। যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস আর রাজনৈতিক অস্থিরতা পেছনে ফেলে ফুটবল মাঠে ইরাকিদের এই জয় দেশটিকে উৎসবের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজায় ইরাক। প্রথমার্ধের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় তারকা ফরোয়ার্ড আলী আল-হামাদির দুর্দান্ত গোলে লিড নেয় তারা। তবে দক্ষিণ আমেরিকান শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইটা সহজ ছিল না। ৩৮ মিনিটে বলিভিয়ার মইজেস পানিয়াগুয়া গোল করে সমতা ফেরালে ম্যাচটিতে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরতির পর কৌশল পরিবর্তন করে ইরাক। ৫৩ মিনিটে আয়মান হুসেইনের এক ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে আবারও এগিয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত এই লিড ধরে রেখে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েছিল ইরাক, ঠিক ৪০ বছর পর আবারও উত্তর আমেরিকার মাটিতেই ফিরছে তারা।
৫২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে কঙ্গো: ইতিহাস গড়লেন তুয়ানজেবে
ইরাকের রূপকথার দিনে অন্য এক ইতিহাস রচিত হয়েছে জাপোপানের আক্রন স্টেডিয়ামে। ক্যারিবিয়ান দেশ জ্যামাইকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ডিআর কঙ্গো। ১৯৭৪ সালে ‘জায়ারে’ নামে শেষবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল দেশটি। দীর্ঘ এই অর্ধশতাব্দীর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কঙ্গো এখন ৪৭ নম্বর দল হিসেবে বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় কোনো দলই জালের দেখা পায়নি। ডিফেন্স এবং গোলকিপিংয়ের দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে (Extra Time)। গ্যালারিতে যখন পেনাল্টি শুট-আউটের আবহ, ঠিক তখনই ১০০ মিনিটের মাথায় জ্যামাইকার রক্ষণভাগ চুরমার করে দেন এক্সেল তুয়ানজেবে। তার এই জয়সূচক গোলটি কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৯৭ সালে দেশের নাম পরিবর্তনের পর এটিই তাদের প্রথম ‘World Cup Qualification’।
২০২৬ বিশ্বকাপের পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাস
ইরাক ও ডিআর কঙ্গোর এই জয় কেবল দুটি দলের অন্তর্ভুক্তি নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলে শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ৪৭ ও ৪৮ নম্বর দল হিসেবে টিকিট পাওয়ার মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের চিত্র এখন পুরোপুরি পরিষ্কার। চেক প্রজাতন্ত্র, সুইডেন এবং ইরাক-কঙ্গোর মতো দলগুলোর প্রত্যাবর্তন টুর্নামেন্টের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের মতো একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য এই সাফল্য জাতীয় সংহতির প্রতীক। অন্যদিকে, ডিআর কঙ্গোর জয় প্রমাণ করে যে আফ্রিকান ফুটবল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। আগামী জুনে শুরু হতে যাওয়া এই আসরে এই দুই ‘Underdog’ দল বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে দেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।