ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঝটিকা অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনায় বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র উত্তজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছে উত্তর কোরিয়া ও ইরান। পিয়ংইয়ং এই ঘটনাকে ‘সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে, অন্যদিকে তেহরান একে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করে ভেনেজুয়েলার পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
পিয়ংইয়ংয়ের কড়া হুঁশিয়ারি: ‘মার্কিন বর্বরতার নতুন নজির’
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ (KCNA) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কিম জং উন প্রশাসন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই অভিযান স্পষ্ট করে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নৃশংস ও দুর্বৃত্ত স্বভাব’ (Brutal and Rogue Nature) এখনো অপরিবর্তিত। উত্তর কোরিয়ার মতে, কোনো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে এভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আটক করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। পিয়ংইয়ং মনে করে, এই ঘটনাটি বিশ্বের যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
তেহরানের সংহতি: ‘অপহরণ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত সরকার ও জনগণের প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। রবিবার (৪ জানুয়ারি) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল পিন্তোর সঙ্গে এক জরুরি ফোনালাপে এই সংহতি প্রকাশ করেন।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাঘচি এই অভিযানকে কেবল সামরিক আগ্রাসন নয়, বরং ‘অপহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের (State Terrorism) একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে পদদলিত করেছে।” তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা এই সংকটে ভেনেজুয়েলার বৈধ সরকারের পাশেই থাকবে।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি
এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় শনিবার (৩ জানুয়ারি), যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় জানান যে, মার্কিন বিশেষ বাহিনী রাতভর অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে। ট্রাম্প তার বিবৃতিতে বলেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং সেখানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রয়োজনে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েন (Military Deployment) করা হতে পারে।
এই অভিযানে মাদুরোর পাশাপাশি তার স্ত্রীকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বা Regime Change অপারেশন ওই অঞ্চলে এক দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় কূটনৈতিক মেরুকরণ
মাদুরোকে আটকের পর থেকে বিশ্ব সম্প্রদায় কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো বিষয়টিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো একে ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন’ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার এই কড়া প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটন ও তেহরান-পিয়ংইয়ংয়ের বিদ্যমান স্নায়ুযুদ্ধকে আরও উসকে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জ (UN) কী ভূমিকা নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।