• আন্তর্জাতিক
  • ইরান-পশ্চিমা বিশ্ব সংঘাত: ১৩তম দিনে রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য, তেলের বাজারে অস্থিরতা ও ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবি

ইরান-পশ্চিমা বিশ্ব সংঘাত: ১৩তম দিনে রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য, তেলের বাজারে অস্থিরতা ও ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবি

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ইরান-পশ্চিমা বিশ্ব সংঘাত: ১৩তম দিনে রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য, তেলের বাজারে অস্থিরতা ও ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবি

তেহরানের তিন শর্তের বিপরীতে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত; হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তেজনা ও বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের দখলে। ইরান অভিমুখে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ সামরিক অভিযানের ১৩তম দিনে এসে সংঘাতের মাত্রা ছাড়িয়েছে সব সীমা। একদিকে তেহরানের ওপর মুহুর্মুহু হামলা, অন্যদিকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে বিশ্ব এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে। যুদ্ধের এই ১৩ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন সহস্রাধিক বেসামরিক মানুষ, আর বিশ্ব অর্থনীতি কাঁপছে তেলের দামের উর্ধ্বগতিতে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে মানবতা: প্রাণহানি ও আহতের পরিসংখ্যান

জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানির দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের ১৩তম দিন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ৩৪৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৭ হাজার। ইউনিসেফ (UNICEF) এই পরিস্থিতিকে এক ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ১০০-এর বেশি শিশু হতাহত হয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়গুলোর একটি।

তেহরানের তিন শর্ত ও ট্রাম্পের ‘বিজয়’ আস্ফালন

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ বন্ধের জন্য তিনটি প্রধান শর্ত পেশ করেছেন: তেহরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে এমন আগ্রাসন রোধে আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে দৃঢ় নিশ্চয়তা।

তবে কূটনীতির এই প্রস্তাবের বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সুর সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন, “আমরা জিতে গেছি। প্রথম ঘণ্টাতেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল।” ট্রাম্পের মতে, মার্কিন হামলায় ইরান প্রায় পর্যুদস্ত। যদিও পেন্টাগনের ব্রিফিং অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রণক্ষেত্র যখন সমুদ্র ও আকাশ: পারস্য উপসাগরে অস্থিরতা

যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। সৌদি আরবের ‘এম্পটি কোয়ার্টার’ মরুভূমি লক্ষ্য করে আসা একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ১১ মার্চ একাই ৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile), ৭টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯টি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। ওমান ও বাহরাইনের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে ড্রোন হামলার ফলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক ধোঁয়া ও আতঙ্ক।

বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) এখন উত্তপ্ত। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা দু’টি জাহাজে গুলি চালিয়েছে। ওমান উপকূল থেকে ২০ জন নাবিককে উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য পথকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

সাইবার যুদ্ধ ও আধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যবহার

প্রথাগত যুদ্ধের সমান্তরালে চলছে তীব্র ‘সাইবার হামলা’ (Cyber Attack)। ইরান-সমর্থিত হ্যাকার গ্রুপ ‘হান্দালা’ দাবি করেছে, তারা বৈশ্বিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইকার্স-এর নেটওয়ার্ক অচল করে ৫০ টেরাবাইট ডাটা সরিয়ে নিয়েছে। এটি মূলত ইরানি স্কুলের ওপর হামলার এক ধরণের ডিজিটাল প্রতিশোধ। অন্যদিকে, ইসরাইল বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘লার্জ স্কেল অ্যাটাক’ বা বড় আকারের অভিযান শুরু করেছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের আগুনের উত্তাপ

যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্লোবাল মার্কেটে (Global Market)। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) তাদের জরুরি মজুদ থেকে রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

১৩তম দিনের এই সংঘাত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এটি কেবল দুটি পক্ষ বা অঞ্চলের যুদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—যা বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Tags: middle east humanitarian crisis donald trump ballistic missile global market iran war israel attack hormuz strait oil price cyber attack