• আন্তর্জাতিক
  • মিনাব ট্র্যাজেডি: ১৭০ স্কুলছাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিল কোন ক্ষেপণাস্ত্র? দায় এড়ানোর লড়াইয়ে ওয়াশিংটন

মিনাব ট্র্যাজেডি: ১৭০ স্কুলছাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিল কোন ক্ষেপণাস্ত্র? দায় এড়ানোর লড়াইয়ে ওয়াশিংটন

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
 মিনাব ট্র্যাজেডি: ১৭০ স্কুলছাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিল কোন ক্ষেপণাস্ত্র? দায় এড়ানোর লড়াইয়ে ওয়াশিংটন

‘টার্গেট লিস্ট’ বিভ্রাটে তছনছ ইরানের শাজারেহ তায়্যেবেহ স্কুল; টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ও ‘ডাবল-ট্যাপ’ আক্রমণের অভিযোগে কাঠগড়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বয়স দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও একটি নির্দিষ্ট ক্ষত এখনো বিশ্ববিবেবককে দংশন করছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের সেই শান্ত সকালটি মুহূর্তেই নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। একটি মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এবং তাতে ১৭০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যু—এই ঘটনাটি কেবল যুদ্ধের ভয়াবহতা নয়, বরং আধুনিক সমরাস্ত্রের ‘টার্গেট সিলেকশন’ বা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের চরম ব্যর্থতাকেও সামনে এনেছে।

মিনাবের সেই অভিশপ্ত সকাল: কী ঘটেছিল সেদিন? গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট। হরমোজগান প্রদেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তায়্যেবেহ’ গার্লস স্কুলে তখন ক্লাসের ব্যস্ততা তুঙ্গে। হঠাৎ একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে যায় দুই তলা বিশিষ্ট স্কুল ভবনটি। ছাদ ধসে পড়ে চাপা পড়েন কোমলমতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ১৭০ জনেরও বেশি মানুষের, যাদের সিংহভাগই ছিল শিশু।

তদন্তে উঠে এসেছে, স্কুলটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)-এর একটি নৌ-ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানজুড়ে চলা বিমান হামলার সময় এই স্কুলটিকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

‘ডাবল-ট্যাপ’ আক্রমণ ও ইরানের কঠোর অবস্থান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই ঘটনার পরপরই ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রকাশ করে একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, এটি ছিল একটি ‘Double-Tap’ আক্রমণ। সামরিক পরিভাষায় এর অর্থ হলো—একই স্থানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো, যাতে প্রথম হামলার পর উদ্ধারকাজে আসা মানুষ বা চিকিৎসাকর্মীদের ওপর আঘাত হানা যায়। ইরান এই ঘটনার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

কারিগরি বিভ্রাট নাকি ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যবস্তু? ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং প্রাথমিক তদন্তে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, এটি একটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘Tomahawk’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘Center for Strategic and International Studies’-এর সিনিয়র উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, এটি ছিল একটি চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা।

তিনি আল জাজিরাকে জানান, সম্ভবত মার্কিন ‘Central Command’ তাদের টার্গেট লিস্ট (Target List) বা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করেনি। কয়েক বছর আগে ভবনটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তা স্কুল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু মার্কিন ‘Targeting Cell’ সম্ভবত পুরনো ডেটা ব্যবহার করায় এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটেছে। স্যাটেলাইট ইমেজেও (Satellite Imagery) দেখা গেছে হামলার সময় আশপাশের আইআরজিসি স্থাপনাগুলো টার্গেটে ছিল।

ওয়াশিংটনের দায় এড়ানোর রাজনীতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দিকে এই হামলার জন্য ইরানকেই পরোক্ষভাবে দায়ী করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের কাছেও ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে—যা সামরিক বিশেষজ্ঞরা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। এদিকে পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনও ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কোনো বেসামরিক স্থাপনা বা স্কুলে হামলা চালায় না।

তবে ‘The New York Times’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল বা ‘Targeting Error’-এর কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রটি স্কুলে আঘাত হেনেছিল। তদন্ত এখনো চলমান থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এই ঘটনা নিয়ে চাপা অস্বস্তি বিরাজ করছে।

সিনেটের চাপ ও এআই-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এই ঘটনায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চাপের মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৪৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর একটি চিঠিতে এই হামলার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত দাবি করেছেন। সিনেটরদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) ব্যবহার করা হয়েছিল কি না। আধুনিক যুদ্ধে এআই চালিত টার্গেটিং সিস্টেম কতটা নির্ভুল, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মিনাব ট্র্যাজেডি।

উপসংহার মিনাবের স্কুলে এই হামলা কেবল একটি ভবন ধ্বংস করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানের প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান ইতিমধ্যেই ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। আধুনিক মারণাস্ত্রের কারিগরি উৎকর্ষের দাবিদার দেশগুলো যখন ‘টার্গেট লিস্ট’ বিভ্রাটের দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে চায়, তখন ১৭০টি নিথর শিশুর দেহ হয়ে ওঠে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিহাস।