মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতির উত্তাপ এবার আছড়ে পড়ল পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায়। ইরাকের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বসরা বন্দরের কাছে একটি মার্কিন মালিকানাধীন তেলবাহী ট্যাংকারে (Oil Tanker) ভয়াবহ হামলায় একজন ভারতীয় ক্রু (Crew) সদস্য নিহত হয়েছেন। এই হামলার পরপরই নিরাপত্তার আশঙ্কায় ইরাকের সমস্ত তেল বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তু: মার্কিন মালিকানাধীন ‘সেফসি বিষ্ণু’ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস এই দুঃখজনক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, হামলার শিকার হওয়া ট্যাংকারটির নাম ‘সেফসি বিষ্ণু’ (Safsea Vishnu)। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এই জাহাজটি মূলত মার্কিন মালিকানাধীন এবং এটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (Crude Oil) বহন করছিল। বসরা বন্দরের কাছে ইরাকি জলসীমায় প্রবেশের পরপরই এটি আক্রমণের শিকার হয়।
ভারতীয় দূতাবাসের তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভারতীয় দূতাবাস জানায়, “আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সেফসি বিষ্ণু ট্যাংকারে হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। তবে জাহাজে থাকা অন্য ১৫ জন ভারতীয় ক্রু সদস্যকে সফলভাবে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।” নিহত ব্যক্তির নাম ও পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। দূতাবাস কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ইরাকি প্রশাসনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং উদ্ধারকৃত নাবিকদের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সহায়তা (Diplomatic Assistance) প্রদান করা হচ্ছে।
হামলার ধরণ: বিস্ফোরক বোঝাই বোট ও জলজ যুদ্ধ ইরাকি বন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হামলাটি চালানো হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। বিস্ফোরক বোঝাই দ্রুতগামী বোটের সাহায্যে দুটি বিদেশি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিস্ফোরণের পরপরই ট্যাংকার দুটিতে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই হামলায় মোট ৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজ অন্যদের সন্ধানে এখনো বঙ্গোপসাগরের সাথে সংযুক্ত এই জলসীমায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান (Search and Rescue Operation) চালানো হচ্ছে।
ইরাকের তেল রফতানিতে স্থবিরতা এই নজিরবিহীন হামলার পর ইরাক সরকার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তাদের সবকটি তেল বন্দরের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। আল-ফাও বন্দরসহ পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা (High Alert) জারি করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর কার্যক্রম আপাতত সচল রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই হামলার ফলে ইরাকের জ্বালানি রফতানি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা (Maritime Security) বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ল।
আঞ্চলিক অস্থিরতার নতুন মাত্রা মধ্যপ্রাচ্যে যখন ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক উত্তেজনা চরম পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন ট্যাংকারে এই হামলা নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো গোষ্ঠী এখনো এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে বিস্ফোরক বোঝাই বোটের ব্যবহার নির্দেশ করছে এটি একটি বড় ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা।
ইরাকি জাতীয় সংবাদ সংস্থা (INA) জানিয়েছে, হামলার কারণ ও নেপথ্যের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ঘটনাটি নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।