মানুষের চোখ কেবল মনের কথা বলে না, শরীরের অভ্যন্তরীণ সুস্বাস্থ্যের বার্তাবাহক হিসেবেও কাজ করে। আয়নায় তাকালে যদি প্রায়ই দেখেন আপনার চোখের সাদা অংশটি লালচে হয়ে আছে, তবে তা কেবল ক্লান্তি বা ধুলোবালির প্রভাব বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, সারাক্ষণ চোখ লাল থাকা হতে পারে গুরুতর কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক সতর্কবার্তা (Early Warning Sign)। সাধারণ সংক্রমন থেকে শুরু করে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি—সবই লুকিয়ে থাকতে পারে এই লাল আভার পেছনে।
নিচে চোখ লাল হওয়ার প্রধান কারণগুলো এবং এর গভীরতা বিশ্লেষণ করা হলো:
১. অ্যালার্জি ও পরিবেশগত কারণ ধুলাবালি, ধোঁয়া, পোলেন (Pollen) কিংবা পোষা প্রাণীর লোম থেকে অনেকেরই তীব্র অ্যালার্জি হয়। এর ফলে চোখের রক্তনালিগুলো ফুলে যায় এবং চোখ লাল দেখায়। একে সাধারণত 'অ্যালার্জিক কনজাংকটিভাইটিস' বলা হয়। এর সঙ্গে চোখে চুলকানি ও অনবরত পানি পড়ার লক্ষণ থাকে।
২. ডিজিটাল স্ট্রেইন: আধুনিক জীবনের অভিশাপ বর্তমান সময়ে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকা চোখের লাল ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। একে বলা হয় 'Digital Eye Strain' বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমরা চোখের পলক কম ফেলি, যার ফলে চোখের মণি শুষ্ক হয়ে যায় এবং রক্তনালিগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
৩. ড্রাই আই সিনড্রোম (Dry Eye Syndrome) বয়স বৃদ্ধি, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (AC) রুমে থাকা কিংবা পর্যাপ্ত পানি পান না করার ফলে চোখে প্রাকৃতিক লুব্রিকেন্ট বা চোখের পানির অভাব দেখা দেয়। একে 'ড্রাই আই সিনড্রোম' বলা হয়। এর ফলে চোখ সারাক্ষণ খসখসে এবং লাল হয়ে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী অস্বস্তির সৃষ্টি করে।
৪. কনজাংকটিভাইটিস বা 'চোখ ওঠা' ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে চোখ ওঠার সমস্যাটি অত্যন্ত পরিচিত। এতে চোখের লাল ভাবের পাশাপাশি আঠালো নিঃসরণ বা পুঁজ তৈরি হতে পারে। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে, তাই এই সময়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
৫. অনিদ্রা ও মানসিক চাপ (Insomnia and Stress) শরীরের পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে চোখের রক্তনালিগুলো অক্সিজেন বঞ্চিত হয় এবং প্রসারিত হয়ে যায়। নিয়মিত ঘুমের অভাব বা অত্যধিক মানসিক চাপের ফলে চোখের চারপাশের পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে লালচে চোখের মাধ্যমে।
৬. রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস: শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতা অনেকেই জানেন না যে, উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) বা ডায়াবেটিসের মতো Systemic Health সমস্যাগুলো সরাসরি চোখে প্রভাব ফেলে। চোখের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ফেটে গেলে চোখ লাল দেখায়। এটি অনেক সময় ‘রেটিনোপ্যাথি’র পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
৭. প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন (Inflammation) চোখের ভেতরের স্তরে প্রদাহ বা ইউভাইটিস (Uveitis) এবং চোখের পাতার ইনফেকশন বা ব্লেফারাইটিস (Blepharitis) হলে চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এটি সরাসরি দৃষ্টিশক্তির ওপর আঘাত হানতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের (Ophthalmologist) পরামর্শ নেবেন? চোখ লাল হওয়ার সাথে সাথে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে মোটেও দেরি করা উচিত নয়:
চোখে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া।
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া (Blurred Vision)।
আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হওয়া বা ফটোফোবিয়া।
চোখ থেকে হলুদ বা সবুজ রঙের পুঁজ নির্গত হওয়া।
যদি এক চোখ হঠাৎ করে অস্বাভাবিক লাল হয়ে যায়।
মনে রাখবেন, চোখ শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। সামান্য অবহেলা কিংবা সঠিক চিকিৎসার অভাব আপনার অমূল্য দৃষ্টিশক্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী লাল ভাবকে গুরুত্ব দিন এবং স্বাস্থ্য সচেতন হোন।