দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও চরম দারিদ্র্যে জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ সংঘাত। দক্ষিণ ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশের আতাক শহরে সরকারি ভবন দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (STC) সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা একটি স্থানীয় সরকারি ভবন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আতাক শহরে সহিংসতার চিত্র ও হতাহতের পরিসংখ্যান
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) আতাক শহরে এসটিসি সমর্থকরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মিছিলটি হঠাতই সহিংস রূপ নেয় এবং সশস্ত্র যোদ্ধারা স্থানীয় সরকারি ভবনের দিকে অগ্রসর হয়ে সেটি দখলের চেষ্টা করে। এ সময় তারা জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলে নিজেদের দলীয় পতাকা উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনী (Security Forces) হস্তক্ষেপ করলে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল গুলি বিনিময় শুরু হয়। শাবওয়া জেনারেল হাসপাতালের উপপ্রধান রামি লামলাস গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অন্তত ৩৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও নতুন মন্ত্রিসভার প্রভাব
এই সহিংসতার নেপথ্যে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। মাত্র কয়েক দিন আগেই সৌদি আরব-সমর্থিত ‘প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল’ (PLC) দেশে একটি নতুন মন্ত্রিসভা বা Cabinet ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই নির্বাহী সংস্থাটি ইয়েমেনের বিভক্ত রাজনৈতিক মেরুকরণ সামাল দিতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব (Regional Representation) নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিল।
তবে এসটিসি-র একাংশ এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো মেনে নিতে না পারায় দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বা Control জোরালো করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত মাসেও তারা দুটি প্রদেশ দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল, যার ফলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রস্থান ও শক্তির ভারসাম্য
দক্ষিণ ইয়েমেনের এই অস্থিরতার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো এই অঞ্চল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) বাহিনীর প্রত্যাহার। দীর্ঘদিন ধরে এসটিসি-কে সমর্থন দিয়ে আসা আমিরাতি সেনারা সম্প্রতি এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে সৌদি সমর্থিত পিএলসি তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরালো করার সুযোগ পেলেও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শেষ চেষ্টা হিসেবে চোরাগোপ্তা হামলা ও সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ চালাচ্ছে।
প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি
শাবওয়ার স্থানীয় নিরাপত্তা কমিটি (Security Committee) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই হামলার উসকানিদাতা এবং যারা সরাসরি অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সরকারি স্থাপনায় হামলা বা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ইয়েমেনের এই অস্থিতিশীল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি (Geopolitical Conflict) কেবল দেশটির অভ্যন্তরেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তিচুক্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।