উত্তর কোরিয়ার রুদ্ধদ্বার রাজনীতিতে ক্ষমতার অলিন্দে কার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের শেষ নেই। সেই রহস্যের জালে নতুন মাত্রা যোগ করল দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা 'ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি' (NIA)। সিউলের দাবি, উত্তর কোরিয়ার বর্তমান একাধিপতি কিম জং উন তার কিশোরী কন্যা কিম জু আয়ে-কে নিজের উত্তরসূরি (Successor) হিসেবে চূড়ান্তভাবে বেছে নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দক্ষিণ কোরিয়ার আইনপ্রণেতাদের কাছে এই সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে।
জু আয়ে-র ক্রমবর্ধমান জনসমক্ষে উপস্থিতি: নিছক স্নেহ নাকি রাজনৈতিক সংকেত? দীর্ঘদিন পর্দার অন্তরালে থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিম জু আয়ে-কে তার বাবার পাশে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে (High-level events) দেখা যাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে কিম জং উনের বেইজিং সফরেও ছায়াসঙ্গী ছিল জু আয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর এবং এর মাধ্যমে তাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক প্রক্রিয়া (Diplomatic Process) শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ-র মতে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জু আয়ে-র উপস্থিতি এবং তাকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদা বিশ্লেষণ করে এটি স্পষ্ট যে, পিয়ংইয়ংয়ের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তার হাতেই তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
পার্টি কংগ্রেস ও ক্ষমতার পালাবদল এই গোয়েন্দা তথ্য এমন এক সন্ধিক্ষণে সামনে এল যখন উত্তর কোরিয়া এ মাসের শেষ দিকে তাদের সবথেকে বড় রাজনৈতিক আয়োজন 'পার্টি কংগ্রেস' (Party Congress) করতে যাচ্ছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন থেকেই দেশটির আগামী পাঁচ বছরের পররাষ্ট্রনীতি (Foreign Policy), যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার (Nuclear Ambition) মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর রূপরেখা নির্ধারিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের কংগ্রেসে কিম জু আয়ে-র অবস্থান এবং উত্তরসূরি হিসেবে তার ভূমিকা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
কিম জু আয়ে: ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রাজপ্রাসাদ ২০২২ সালে প্রথমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আত্মপ্রকাশ ঘটে কিম জু আয়ে-র। সে সময় তাকে তার বাবার হাত ধরে উত্তর কোরিয়ার অত্যাধুনিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে তার বয়স ১৩ বছর বলে ধারণা করা হয়। কিম জং উন ও তার স্ত্রী রি সোল-জু’র এই কন্যাসন্তানকে নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে নানা জল্পনা থাকলেও, কিমের কোনো জ্যেষ্ঠ পুত্র আছে কি না তা এখনো এক রহস্য। দক্ষিণ কোরীয় গোয়েন্দাদের দাবি, কিমের একজন বড় ছেলে থাকতে পারে, তবে জনসমক্ষে তার কোনো অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ উত্তর কোরিয়ার রাজনীতি মূলত গভীর পুরুষতান্ত্রিক (Patriarchal) কাঠামোয় অভ্যস্ত। এমন একটি সমাজব্যবস্থায় এক কিশোরীকে দেশের সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) হিসেবে মেনে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে খোদ দক্ষিণ কোরিয়ার ভেতরেই সংশয় রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, কিম জং উন তুলনামূলক তরুণ ও সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কেন এত দ্রুত ১৩ বছর বয়সী একজনকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রোমোট করছেন, তা ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অতীতে কিম জং উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এই তরুণ নেতা হয়তো দেশকে উন্মুক্ত করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। এখন প্রশ্ন উঠছে, কিম জু আয়ে যদি ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার হাল ধরেন, তবে কি দেশটির কঠোর একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটবে নাকি কিম রাজবংশের পারমাণবিক শক্তির আস্ফালন আরও তীব্র হবে? পিয়ংইয়ংয়ের এই রাজনৈতিক সমীকরণ বর্তমানে গোটা বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে এক বিশাল ধাঁধা।