ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে (NDTV) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে জামায়াতে ইসলামী তার ‘Strategic Priority’ বা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং নাগরিক অধিকার নিয়েও দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি।
প্রতিবেশী প্রথম: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
সাক্ষাৎকারে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) বাস্তবতায় একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।”
তার এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে জামায়াতের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
‘সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু’ বিভাজনের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত সহিংসতার অভিযোগ এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে এনডিটিভির প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে সমঅধিকারের কথা বলেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা সবাই প্রথম শ্রেণির নাগরিক। আমরা কখনোই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু—এই দুই ভাগে বিভক্ত করাকে সমর্থন করি না। এখানে সবার পরিচয় একটাই, আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং Minority Rights বা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করেন।
ভারত সফর ও নির্বাচনোত্তর পরিকল্পনা
নির্বাচনের পর ভারত সফর করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান জানান, এ বিষয়ে তার কোনো ব্যক্তিগত দ্বিধা বা বাধা নেই। তিনি বলেন, “ভারত সফরের দরজা আমাদের জন্য খোলা। নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেব।” জামায়াত আমিরের এই মন্তব্যকে দিল্লির সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব কমানোর একটি ‘Diplomatic Move’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গণতন্ত্রে ফেরার পরীক্ষা: ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার আজ নির্ধারণ করবেন আগামীর বাংলাদেশ। এই নির্বাচনকে দেশে প্রকৃত গণতন্ত্রে ফেরার একটি বড় পরীক্ষা বা ‘Democratic Transition’ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই জোটে যুক্ত হয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (NCP), যা মূলত তরুণ প্রজন্মের বিপ্লবীদের দ্বারা গঠিত।
নির্বাচনী মাঠের প্রধান ইস্যু হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বা Job Creation এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার করে Economic Stability ফিরিয়ে আনা। বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই নির্বাচনে জামায়াত আমিরের ভারত-নীতি বিষয়ক বার্তা দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।