ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরিবর্তনের এক নতুন জোয়ার দেখেছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে যেমন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের জয়জয়কার হয়েছে, তেমনি রাজপথ কাঁপানো তরুণ নেতৃত্বের অভিষেকও ঘটেছে দাপটের সঙ্গে। তবে সব আলোচনাকে ছাপিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (NCP)-র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, তিনিই হতে যাচ্ছেন এই সংসদের সবচেয়ে কম বয়সী সংসদ সদস্য (MP)। মাত্র ২৬ বছর বয়সে আইনসভায় পা রেখে তিনি তৈরি করেছেন এক অনন্য নজির।
হাতিয়ার দুর্গম জনপদে মাসউদের চমকপ্রদ বিজয়
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসন থেকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন হান্নান মাসউদ। নির্বাচনি ফলাফল অনুযায়ী, তিনি ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট। হাতিয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসনে একজন তরুণের এই জয়কে স্থানীয় বিশ্লেষকরা বড় ধরনের ‘Political Upset’ এবং নতুন প্রজন্মের জাগরণ হিসেবে দেখছেন।
বয়সের সমীকরণ: জেনারেশন-জেড-এর প্রতিনিধি
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, আবদুল হান্নান মাসউদের জন্ম ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি। সেই হিসেবে বর্তমানে তার বয়স মাত্র ২৬ বছর ১ মাস। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এত কম বয়সে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার ঘটনা বিরল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর। মাসউদ সেই শর্ত পূরণ করে একেবারে কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে ‘Generation Z’-এর কণ্ঠস্বর হয়ে সংসদে যাওয়ার ছাড়পত্র পেলেন।
রাজপথের লড়াই থেকে আইনসভার মঞ্চে
হান্নান মাসউদের এই উত্থান একদিনে হয়নি। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির একজন লড়াকু নেতা (Frontline Leader)। রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়। ছাত্র-জনতার সেই বিপ্লবের পর তিনি নতুন ধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং এনসিপিতে যোগ দেন। এবারের নির্বাচনে তার বিজয় কেবল একটি আসনের জয় নয়, বরং এটি জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট বা চেতনারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা।
নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রত্যাশা
প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করা হান্নান মাসউদকে নিয়ে হাতিয়াবাসীর প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই দ্বীপ অঞ্চলের উন্নয়ন এবং মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের মন জয় করেছেন। বিজয়ী হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, হাতিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে তিনি প্রয়োজনে সরাসরি উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করবেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন থাকবেন।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, হান্নান মাসউদের মতো তরুণদের সংসদে উপস্থিতি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের সাহসিকতার সংমিশ্রণে একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।