ঢাকা ও ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে সূচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ ৯ মাসের নিবিড় নেগোসিয়েশন ও গঠনমূলক আলোচনার পর অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (ART) বা এআরটি চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আরোপিত পাল্টা শুল্ক বা রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
চুক্তির প্রেক্ষাপট: শুল্ক হ্রাসের নেপথ্যে সফল কূটনীতি ২০২৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক নির্বাহী আদেশের (Executive Order 14257) ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ওপর বিভিন্ন হারে রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ (RT) আরোপিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এই শুল্কের হার বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং সফল দরকষাকষির ফলে তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
তৈরি পোশাক খাতে বিপ্লব: শূন্য শুল্কের হাতছানি বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক (Ready-made Garments) খাত থেকে। এই চুক্তিতে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশেষ ধারা রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা (Cotton) এবং কৃত্রিম তন্তু (Man-made Fiber) আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে, তবে সেক্ষেত্রে কোনো রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ দিতে হবে না। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত পণ্য শতভাগ শূন্য শুল্ক বা জিরো ট্যারিফ (Zero Tariff) সুবিধায় মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই পোশাক, তাই এই সুবিধা রফতানি আয়ে বড় ধরণের উল্লম্ফন ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২৫০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও মার্কেট অ্যাক্সেস এআরটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা বা মার্কেট অ্যাক্সেস (Market Access) নিশ্চিত হয়েছে। এই তালিকায় ওষুধ (Pharmaceuticals), কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উচ্চ সম্ভাবনাময় খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার পণ্য চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং বাকি পণ্যগুলোর শুল্ক আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।
ডিজিটাল ট্রেড ও আইপিআর: অন্যান্য দেশের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র এর আগে মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর সঙ্গে একই ধরণের চুক্তি করলেও বাংলাদেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। মালয়েশিয়া বা কম্বোডিয়ার চুক্তিতে ডিজিটাল ট্রেড (Digital Trade) সংক্রান্ত বিষয়ে আগে থেকে মার্কিন আলোচনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্ত রাখা হয়নি। এছাড়া, বাংলাদেশ আগে থেকেই ডব্লিউটিও (WTO) ট্রিপস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী হওয়ায় নতুন কোনো কঠিন শর্ত আরোপিত হয়নি। তবে ই-কমার্স, মেধা সম্পদ সংরক্ষণ (IPR Enforcement) এবং পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিনিয়োগ ও কৌশলগত আমদানির অঙ্গীকার চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং বিমান (Boeing), এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন ও গম আমদানির প্রচেষ্টা বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেডিকেল ডিভাইস ও জীবনদায়ী ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন এফডিএ (FDA) সনদ থাকলেই সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে। তেল, গ্যাস ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইকুইটি সীমা বা লিবারালাইজেশন (Liberalization) বাড়ানোর বিষয়েও সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
এক্সিড ক্লজ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এই চুক্তির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘এক্সিট ক্লজ’ (Exit Clause) সংযোজন। অর্থাৎ, প্রয়োজনে যেকোনো সময় চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে অনেক দেশের চুক্তিতে ছিল না। সামগ্রিকভাবে, এই এআরটি চুক্তি মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের সক্ষমতা (Competitiveness) বাড়াবে এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে (Supply Chain) বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত করবে। এটি কেবল শুল্ক হ্রাস নয়, বরং মার্কিন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং নতুন কর্মসংস্থান (Job Creation) সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।