ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ যখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই রণক্ষেত্রে শুরু হয়েছে নতুন করে তাণ্ডব। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের (Full-scale Military Operation) চার বছর পূর্তির ঠিক আগে, আলোচনার টেবিলে বসার কয়েক ঘণ্টা আগে একে অপরের ওপর ইতিহাসের অন্যতম বড় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকের আগে এমন বিধ্বংসী সংঘাত বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
আকাশপথে রুশ তাণ্ডব: ধ্বংসস্তূপে ওডেসা ও দেনিপ্রোপেট্রোভস্ক ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর (Air Force) তথ্যানুযায়ী, গত রাতটি ছিল ইউক্রেনের জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। রুশ বাহিনী একযোগে ৩৯৬টি ড্রোন এবং ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইউক্রেনের বিভিন্ন প্রান্তে। যদিও ইউক্রেনীয় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ৩৬৭টি ড্রোন এবং ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও এর আঁচ থেকে রক্ষা পায়নি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ওডেসা ও দেনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলে। হামলায় একাধিক আবাসিক ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার (Industrial Infrastructure) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আহত হয়েছেন অনেক বেসামরিক নাগরিক। বিশ্লেষকদের মতে, জেনেভা আলোচনার আগে ইউক্রেনের ওপর মানসিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতেই মস্কোর এই আক্রমণ।
পাল্টা মারে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার হামলার জবাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি ভলোদিমির জেলেনস্কির বাহিনীও। ইউক্রেন সরাসরি রাশিয়ার জ্বালানি ও অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত হানার কৌশল নিয়েছে। রাশিয়ার ক্রাসনোদার ক্রাই অঞ্চলের ইলস্কি তেল শোধনাগারে (Oil Refinery) ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, হামলায় তেলজাত পণ্যের একটি বিশালাকার স্টোরেজ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া রুশ-নিয়ন্ত্রিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ক্রিমিয়াতেও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে কিয়েভ। সেভাস্তোপলের গভর্নর জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ের দীর্ঘতম এই হামলায় একটি শিশু আহত হয়েছে। রাশিয়ার দাবি, তারা রাতভর ইউক্রেনের অন্তত ১৫১টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা প্রমাণ করে যে, আলোচনার টেবিলে বসার আগে উভয় পক্ষই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান বা ‘Leverage’ নিশ্চিত করতে চাইছে।
জেনেভা বৈঠক: কূটনৈতিক সমাধান নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা? আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনব্যাপী এই জেনেভা বৈঠকটি আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে দীর্ঘতম এই সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা (Diplomacy) এখন তুঙ্গে।
তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ সন্দিহান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসছে, কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টাপাল্টি আস্ফালন কোনো শক্তিশালী যুদ্ধবিরতি বা বড় কোনো সমঝোতার (Breakthrough) ইঙ্গিত দিচ্ছে না। জেনেভার এই বৈঠক মূলত উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের মধ্যে একটি ‘টেস্টিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
যুদ্ধের ৪ বছর: এক অমীমাংসিত সংঘাতের ভবিষ্যৎ রাশিয়ার সামরিক অভিযানের চার বছরে পদার্পণ করার মুহূর্তে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে জেনেভার দিকে। একদিকে ড্রোন প্রযুক্তি ও আর্টিলারি যুদ্ধের ভয়াবহতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে বিশ্ব রাজনীতি। আলোচনার শুরুতেই এমন বিধ্বংসী হামলা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে শীতল করার বদলে আরও উত্তপ্ত করে তুলল কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।