বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেভারিট হিসেবে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ আবারও দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইতালির বিপক্ষে লড়াইটা একপর্যায়ে কঠিন মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত গতির ঝড় তুলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ক্যারিবীয়রা। তবে এই ম্যাচটি ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য নয়, বরং পেসার শামার জোসেফের গড়া এক বিরল বিশ্বরেকর্ডের জন্য। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি (International T20) ক্রিকেটে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে ৪ উইকেট ও ৪টি ক্যাচ নেওয়ার অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন এই ডানহাতি পেসার।
ইতালির প্রতিরোধ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের চ্যালেঞ্জ
ইডেনে গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে টসে জিতে আগে ব্যাটিং করতে নেমে ১৬৫ রানেই থমকে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। চলতি বিশ্বকাপে আগে ব্যাটিং করে এটিই ছিল তাদের সর্বনিম্ন স্কোর। ইতালির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ২০৩ রান তাড়া করতে গিয়ে ১৭৮ রান তোলার আত্মবিশ্বাস ক্যারিবীয় শিবিরে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। ১৬৬ রানের টার্গেট নিয়ে খেলতে নেমে ইতালীয়রা হয়তো রূপকথা গড়ার স্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু শামার জোসেফের একক নৈপুণ্যে তাদের সেই স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
শামার জোসেফের ঐতিহাসিক 'ডাবল'
ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে বোলারদের দাপট নতুন কিছু নয়, কিন্তু ফিল্ডিং ও বোলিংয়ে সমানভাবে প্রভাব ফেলা বিরল। শামার জোসেফ ইতালির বিপক্ষে ৪ ওভার বোলিং করে মাত্র ৩০ রান দিয়ে শিকার করেন ৪টি উইকেট। তার শিকারের তালিকায় ছিলেন হ্যারি মানেতি, গ্রান্ট স্টেওয়ার্ট, থমাস ড্রাকা ও আলী হাসান।
তবে জোসেফ কেবল বল হাতেই ক্ষান্ত থাকেননি; সীমানায় ও ইন-ফিল্ডে দাঁড়িয়ে একে একে তালুবন্দি করেছেন ৪টি ক্যাচ। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি (Professional T20) ক্রিকেটে এর আগে মাত্র ৫ জন ক্রিকেটার এক ম্যাচে ৪ উইকেট ও ৪ ক্যাচ নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। যার মধ্যে সর্বশেষটি ছিল ২০২৪ সালের বিপিএলে চট্টগ্রামের কার্টিস ক্যাম্ফারের। তবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি (T20I) কিংবা নারী আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এর আগে এমন কীর্তি আর কেউ গড়তে পারেননি।
শাই হোপের ব্যাটিং ধ্রুপদী ও ম্যাথু ফোর্ডের আঘাত
বোলিংয়ে জোসেফের দাপটের আগে ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেনেছেন ওপেনার শাই হোপ। দলের বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ৪৬ বলে ৭৫ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ৬টি চার ও ৪টি নান্দনিক ছক্কা। মূলত হোপের এই দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করেই চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ পায় ক্যারিবীয়রা। ফলস্বরূপ, শামার জোসেফের রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স সত্ত্বেও 'প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ' (Player of the Match) পুরস্কারটি ওঠে হোপের হাতেই।
বোলিংয়ে জোসেফকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন ম্যাথু ফোর্ড। ৩ উইকেট নিয়ে তিনি ইতালির ব্যাটিং অর্ডারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেনও ছিলেন নিয়ন্ত্রিত। শেষ পর্যন্ত ১৮ ওভারের মধ্যে মাত্র ১২৩ রানেই All-out হয়ে যায় ইতালি।
সুপার এইটের আগে বড় বার্তা
এই জয়ের মাধ্যমে 'সি' গ্রুপ থেকে অপরাজিত হিসেবে সুপার এইট (Super Eight) নিশ্চিত করল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৪ ম্যাচের সব কটিতে জিতে তারা জানান দিল, ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে তারা কতটা ভয়ংকর। অন্যদিকে, ইতালির হারলেও ক্রিকেটের উঠতি শক্তি হিসেবে তারা নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে এই টুর্নামেন্টে। তবে দিনের শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই একজনই—শামার জোসেফ, যিনি বল আর হাতের তালুর জাদুতে ক্রিকেট বিশ্বকে উপহার দিলেন নতুন এক পরিসংখ্যান।