টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের (ICC T20I Rankings) শীর্ষস্থানে থাকা ব্যাটার যখন বিশ্বকাপের মঞ্চে রান পেতে লড়াই করেন, তখন চাপটা কেবল সেই ক্রিকেটারের ওপর থাকে না, গোটা দলের পরিকল্পনাই এলোমেলো হয়ে যায়। ভারতীয় ক্রিকেট এখন ঠিক এই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওয়ানডে স্টাইলে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত অভিষেক শর্মা চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজের ছায়া হয়ে আছেন। সুপার এইটের (Super Eight) গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাত্র ১৫ রান করে সাজঘরে ফেরায় বাড়ছে উদ্বেগ। তবে এই কঠিন সময়ে তরুণ এই ওপেনারের ওপর আস্থা হারাননি দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ক্রিকেটার ফাফ ডু প্লেসি (Faf du Plessis)।
বিশ্বকাপের চাপ ও প্রত্যাশার পাহাড়
চলমান বিশ্বকাপে অভিষেকের ধারাবাহিক অফ ফর্ম ভারতকে চরম ভোগাচ্ছে। পাওয়ার প্লে-তে (Powerplay) দ্রুত উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যাচ্ছে টিম ইন্ডিয়া, যার প্রভাব পড়ছে মিডল অর্ডারের ওপর। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানের বড় ব্যবধানে হার কেবল পয়েন্টই কেড়ে নেয়নি, ভারতের নেট রান রেটেও (Net Run Rate) বড় ক্ষত তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইএসপিএন ক্রিকইনফোর (ESPN Cricinfo) এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ডু প্লেসি বিশ্লেষণ করেছেন অভিষেকের বর্তমান মানসিক অবস্থা। তিনি মনে করেন, পারফরম্যান্সের চেয়েও বাইরের আলোচনা এখন অভিষেকের জন্য বড় বাধা। ফাফ বলেন, "এই মুহূর্তে বিশ্বের সবাই তাকে নিয়ে কথা বলছে। হাজারটা মতামত, পঞ্চাশের বেশি কোচ—সবাই তাকে শেখাতে চাইবে কীভাবে ব্যাট করা উচিত। ২৫ বছর বয়সী একজনের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি, যখন সে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে এবং তার ওপর প্রত্যাশার পাহাড় চেপে আছে।"
‘রক্ষণাত্মক নয়, আক্রমণই অভিষেকের শক্তি’
অভিষেক শর্মার খেলার ধরন নিয়ে ক্রিকেট মহলে কাটাছেঁড়া চললেও ডু প্লেসি তাকে নিজের সহজাত ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। গত দুই-তিনটি আইপিএল (IPL) মৌসুমে অভিষেকের রুদ্রমূর্তি দেখে মুগ্ধ ফাফ জানান, "সে নতুন প্রজন্মের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার, যারা রক্ষণাত্মক ব্যাটিংয়ের কথা চিন্তাই করে না। তার হাতে আক্রমণের জন্য প্রচুর শট রয়েছে। গত বছর সে বোলারদের ওপর রীতিমতো দাপট দেখিয়েছে। এখন তার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাইরের আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং নিজের শক্তির জায়গায় ফোকাস করা।"
ফাফের মতে, একজন ক্রিকেটারের যখন সময় খারাপ যায়, তখন তার মগজ বা মাইন্ডসেট পরিষ্কার রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের আসন্ন ম্যাচগুলোতে অভিষেক ঠিকই স্বরূপে ফিরবেন এবং বিশ্বকাপের কোনো এক মোড়ে একাই ম্যাচ জেতানো ইনিংস উপহার দেবেন।
ভারতীয় টপ অর্ডারে বাঁ-হাতিদের আধিপত্য ও দুশ্চিন্তা
বিশ্বকাপের ঠিক আগে নিউজিল্যান্ড সিরিজে ঈশান কিষাণের দুর্দান্ত ফর্ম নির্বাচকদের নতুন ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে বিশ্বকাপে অভিষেক শর্মা ও ঈশান কিষাণের ওপেনিং জুটি দেখা যাচ্ছে। তবে এতে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা। টপ অর্ডারের প্রথম তিন ব্যাটারই—অভিষেক, ঈশান এবং তিনে নামা তিলক ভার্মা—সবাই বাঁ-হাতি।
স্কোয়াডে সাঞ্জু স্যামসনের (Sanju Samson) মতো অভিজ্ঞ ও কার্যকরী ব্যাটার থাকলেও টিম ম্যানেজমেন্ট এখনো অভিষেকের ওপরই ভরসা রাখছে। তবে সেমিফাইনালের সমীকরণে টিকে থাকতে হলে এই ভরসার প্রতিদান অভিষেককে দ্রুতই দিতে হবে।
সেমিফাইনালের সমীকরণ: সামনে জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ
দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর ভারতের জন্য সেমিফাইনালের পথ এখন কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ। সুপার এইটের বাকি দুই ম্যাচে ভারতের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে ও অন্যতম আয়োজক দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কেবল এই দুই ম্যাচ জিতলেই চলবে না, ভারতকে তাকিয়ে থাকতে হবে গ্রুপের অন্য ম্যাচগুলোর ফলাফলের দিকেও।
এখন দেখার বিষয়, ডু প্লেসির অভয়বাণী অভিষেকের ব্যাটে কোনো জাদুকরী পরিবর্তন আনে কি না। ভারতের কোটি কোটি ভক্তের প্রত্যাশা, জিম্বাবুয়ে ম্যাচ দিয়েই ফর্মে ফিরবেন বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটার এবং টিম ইন্ডিয়াকে পৌঁছে দেবেন কাঙ্ক্ষিত সেমিফাইনালের মঞ্চে।