মেক্সিকোর জালিস্কো অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সহিংসতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মাঝেও ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) আয়োজক হিসেবে মেক্সিকোর অবস্থান অটুট থাকছে। বিশেষ করে ভেন্যু তালিকা থেকে ‘গুয়াদালাহারা’ বাদ পড়ার যে গুঞ্জন উঠেছিল, তা নাকচ করে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে, মেক্সিকো থেকে কোনো ‘হোস্ট সিটি’ (Host City) সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই।
সহিংসতার প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তার সংকট
গত রোববার মেক্সিকোর দুর্ধর্ষ মাদক পাচারকারী সংগঠন ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন’-এর প্রধান নেতা ‘এল মেনচো’র সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। এই অভিযানে কার্টেল প্রধানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মেক্সিকোর অন্তত আটটি রাজ্যে ব্যাপক দাঙ্গা ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে জালিস্কো রাজ্যে সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি পোড়ানোর মতো ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো, এই সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গুয়াদালাহারা শহর থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার দূরত্বে। যেহেতু গুয়াদালাহারা আগামী বিশ্বকাপের তিনটি মেক্সিকান আয়োজক শহরের একটি, তাই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল—এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না।
গভর্নর পাবলো লেমুসের দৃঢ় অবস্থান
উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে জল্পনা থামাতে এগিয়ে এসেছেন জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপের সূচি বা ভেন্যু পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। লেমুস বলেন, “মেক্সিকো থেকে কোনো আয়োজক শহর সরিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ফিফার নেই। তিনটি আয়োজক শহরই তাদের স্ব স্ব অবস্থানে বহাল থাকছে। এমনকি পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা প্রমাণ করতে আগামী শনিবার জালিস্কোর ঐতিহাসিক অ্যাক্রন স্টেডিয়ামে (Akron Stadium) ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি প্রদর্শন করা হবে।”
ইনফান্তিনোর সমর্থন ও ‘সিকিউরিটি প্রোটোকল’
মেক্সিকো সরকার ও ফুটবল ফেডারেশনের ওপর পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি জানান, ফিফা নিয়মিত মেক্সিকান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং প্রতিটি মুহূর্ত নিবিড়ভাবে ‘মনিটরিং’ (Monitoring) করা হচ্ছে।
ইনফান্তিনো এক বিবৃতিতে বলেন, “ফুটবল বিশ্বে মেক্সিকো এক উজ্জ্বল ও ঐতিহ্যবাহী দেশ। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই ঘটতে পারে। তবে আমাদের বিশ্বাস আছে মেক্সিকোর দায়িত্বশীল সরকার এবং তাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। তারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর ‘সিকিউরিটি প্রোটোকল’ (Security Protocol) অনুসরণ করছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতির প্রতি ফিফার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখা হবে না।
ফুটবল ঐতিহ্যের জয়
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেক্সিকোর এক অনন্য স্থান রয়েছে। প্রথম দেশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে তারা। আমেরিকা ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এই মেগা ইভেন্টে মেক্সিকোর আবেগ ও ফুটবল সংস্কৃতিকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে রাজি নয় ফিফা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিফার এই ইতিবাচক অবস্থান কেবল মেক্সিকোর ফুটবল প্রেমীদের জন্যই নয়, বরং দেশটির পর্যটন ও অর্থনীতির জন্যও বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে মেক্সিকান আর্মি ও ফেডারেল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যা বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন।