বিনোদন জগতের গ্ল্যামার আর আলোর ঝলকানি যে সব সময় সুখের বার্তা বয়ে আনে না, তার এক চরম ও মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে রইল ইভনাথ খান ইকরার মৃত্যু। ছোটপর্দার পরিচিত মুখ জাহের আলভীর স্ত্রী ইকরার রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনায় এখন স্তব্ধ পুরো শোবিজ ইন্ডাস্ট্রি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ইকরার নিথর দেহটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং অনেকগুলো অনুচ্চারিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই অকাল প্রয়াণে সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) শোক ও ক্ষোভের যে জোয়ার বইছে, তাতে উঠে আসছে বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক যন্ত্রণা এবং পরকীয়ার কর্কট রোগের কথা।
ফেসবুকের সেই ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ ও রহস্যময় ইঙ্গিত ইকরার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে থেকেই জাহের আলভীর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে কিছু রহস্যময় বা ক্রিপটিক (Cryptic) পোস্ট লক্ষ্য করা গিয়েছিল। আলভী লিখেছিলেন, ‘ভুল করলে মাফ মিলে, কিন্তু মুক্তি মেলে না।’ সেই পোস্টে ইকরার করা মন্তব্যটি এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল (Viral)। ইকরা লিখেছিলেন, “অভিনন্দন! ভুল স্বীকার করতে পারলা! আমিন! আমার আমিকে মুক্তি করে দিলাম, আবার কাঁদছ কেন!” নেটিজেনদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই কথোপকথনই বলে দিচ্ছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের ফাটল কতটা গভীর ছিল। আলভীর সহকর্মী ইফফাত আরা তিথির সঙ্গে পরকীয়ার গুঞ্জনই যে ইকরাকে এই চরম পথে ঠেলে দিয়েছে, সেই ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট।
তারকাদের ক্ষোভ ও সহমর্মিতা ইকরার এই করুণ বিদায়ে বিনোদন জগতের শীর্ষ তারকারা নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তাদের স্ট্যাটাসে ফুটে উঠেছে এক বিষণ্ণ আর বাস্তবচিত্র।
জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখেছেন, "কিছু মানুষ এতটা ভালোবেসে ফেলে যে ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে। আসলে এই নিষ্ঠুর জগৎটা বোধহয় এই সহজ-সরল মানুষগুলোর জন্য নয়।" তৌসিফের এই লেখায় ইকরার প্রতি গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী তমা মির্জা সরাসরি আঙুল তুলেছেন সফল পুরুষদের বিশ্বাসঘাতকতার দিকে। তিনি লিখেছেন, "একটা মেয়ে পুরো পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করে ভালোবাসার মানুষের হাত ছাড়ে না। আর সেই মানুষটা যখনই সফলতা পায়, প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই সবার আগে ওই মেয়েটাকেই ঠকায়। ইকরা হয়তো বেঁচে থেকে যে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল, তার চেয়ে কম যন্ত্রণার কোনো আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে ওপাড়ে।" তমার এই সাহসী বয়ানটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মেন্টাল হেলথ ও সামাজিক সচেতনতা অভিনেত্রী তাসনুভা তিশা বিষয়টিকে দেখেছেন মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) জায়গা থেকে। ইকরাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ মা ও স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সমাজের উদাসীনতা নিয়ে। তিশার মতে, যারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে, তাদের একাকীত্বের সময় পাশে দাঁড়ানোটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
একই সুরে কথা বলেছেন অভিনেত্রী শাম্মী ইসলাম নীলা। তিনি তরুণীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, নিজের কল্পনা দিয়ে কাউকে ‘গুড বয়’ হিসেবে তৈরি না করে মানুষের আচরণ দেখে তাকে চেনা উচিত।
তদন্ত ও আইনি প্রত্যাশা ইকরার মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা এবং বিনোদন জগতের অভ্যন্তরীণ সংকটের এক দর্পণ। পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে এবং ঘটনার পেছনে কোনো প্ররোচনা বা মানসিক নির্যাতন (Mental Torture) ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে। শোবিজ সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইকরার এই আত্মহননের পেছনে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গ্ল্যামারের আড়ালে আর কোনো প্রাণ যেন এভাবে ঝরে না পড়ে, সেটিই এখন বড় প্রার্থনা।