মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের কালো মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হওয়ায় সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজেদের দূতাবাস কর্মীদের বড় একটি অংশকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ইরানের পক্ষ থেকে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৃষ্ট ‘Security Risk’ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন এই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (State Department) থেকে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ নোটিশ জারি করা হয়।
নিরাপত্তা প্রটোকল ও দ্রুত প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ‘Non-emergency’ বা জরুরি প্রয়োজনে নিয়োজিত নন—এমন কর্মকর্তা-কর্মী এবং সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে দেশত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে হবে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের একের পর এক ‘Drone and Missile Strikes’ এর ফলে মার্কিন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ায় এই ‘Precautionary Measure’ গ্রহণ করেছে বাইডেন প্রশাসন।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য কঠোর ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি দূতাবাস কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জন্যও একটি উচ্চপর্যায়ের ‘Travel Advisory’ জারি করেছে ওয়াশিংটন। যারা ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সৌদি আরবে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বর্তমানে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মার্কিন স্থাপনা ও স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক এলাকাগুলোকেও টার্গেট করা হচ্ছে। এছাড়া সশস্ত্র সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় কঠোর বিধিনিষেধের বিষয়গুলো মাথায় রেখে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ব্যর্থ পরমাণু সংলাপ ও যুদ্ধের পটভূমি সংকটময় এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে গত ফেব্রুয়ারি মাসে। ইরানের পরমাণু প্রকল্প (Nuclear Project) নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিনব্যাপী আলোচনা চলে। তবে কোনো প্রকার সমঝোতা বা ‘Nuclear Deal’ ছাড়াই সেই সংলাপ ব্যর্থ হয়। এর ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর ‘Operation Epic Fury’ (অপারেশন এপিক ফিউরি) শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ওয়াশিংটনের অন্যতম মিত্র ইসরায়েলও ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের সামরিক অভিযান ‘Operation Roaring Lion’ (অপারেশন রোয়ারিং লায়ন) শুরু করে।
ইরানের পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই দ্বিমুখী হামলার জবাবে ইরানও তার সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ‘Military Bases’ বা সেনাঘাঁটি এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে তেহরান। গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, মার্কিন দূতাবাস সংলগ্ন এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলের স্থাপনায় (Oil Installations) বেশ কয়েকবার ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যেকার এই ছায়াযুদ্ধ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বড় সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, নিকট ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে পেন্টাগন এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।