চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (Champions League) মঞ্চে ম্যানচেস্টার সিটির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার আগে রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরের ওপর ছিল শঙ্কার কালো মেঘ। ইনজুরি আর কার্ডের খাঁড়ায় দলে নেই কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যাম কিংবা রদ্রিগোর মতো হেভিওয়েট তারকারা। কিন্তু সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই অন্ধকার রাতকে একাই আলোকিত করলেন উরুগুইয়ান তারকা ফেদেরিকো ভালভার্দে। তাঁর অপ্রতিরোধ্য হ্যাটট্রিকে (Hat-trick) ইউরোপের সেরা ক্লাব আসরের শেষ ১৬-র প্রথম লেগে সিটিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখল ‘লস ব্লাঙ্কোস’রা।
২২ মিনিটের ইতিহাস: রেকর্ডবইয়ে ভালভার্দে ম্যাচ শুরুর আগে অনেকেই রিয়ালকে পিছিয়ে রেখেছিলেন। তবে প্রথমার্ধেই শুরু হয় ভালভার্দে-ম্যাজিক। মাত্র ২২ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি দর্শনীয় গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ক্লাবের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম মিডফিল্ডার (Midfielder) হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করলেন এই উরুগুইয়ান ‘ইঞ্জিন’। এই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে নিজের ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা এক রাতেই দ্বিগুণ করে নিয়েছেন তিনি।
কে এই ‘জুয়ানিতো’? আরবেলোয়ার চোখে উত্তরসূরি ম্যাচ শেষে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ আলভারো আরবেলোয়া যেন প্রশংসার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি ভালভার্দেকে ‘একবিংশ শতাব্দীর জুয়ানিতো’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মাদ্রিদিস্তাদের কাছে জুয়ানিতো কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক আবেগের নাম। সত্তরের দশকের সেই লড়াকু স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের ড্রিবলিং আর হার না মানা মানসিকতা রিয়ালের ডিএনএ-তে (DNA) মিশে আছে। আরবেলোয়ার মতে, মাঠের প্রতিটি প্রান্তে ভালভার্দের যে এনার্জি (Energy) এবং লড়াকু মনোভাব দেখা যায়, তা কিংবদন্তি জুয়ানিতোকেই মনে করিয়ে দেয়। সমর্থকদের ভালোবাসায় আজও বার্নাব্যুতে ম্যাচের সপ্তম মিনিটে জুয়ানিতোর স্মরণে স্লোগান ওঠে—সেই একই শ্রদ্ধা এখন ভালভার্দে আদায় করে নিচ্ছেন।
সতীর্থদের চোখে বিশ্বের ‘সেরা মিডফিল্ডার’ ভালভার্দের এই বিধ্বংসী রূপে মুগ্ধ রিয়ালের বর্তমান সতীর্থ ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড। তিনি বলেন, “ভালভার্দে সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড (Underrated) ফুটবলারদের একজন। ওর খেলায় কোনো দুর্বলতা নেই। ও একাধারে রক্ষণ সামলাতে পারে আবার হ্যাটট্রিকও করতে পারে। আমার মতে, বর্তমান বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের তালিকায় ও সবার শীর্ষে।” আরবেলোয়া আরও যোগ করেন, ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে ভালভার্দে যেমন ট্রেন্টকে ডিফেন্সে (Defence) সহায়তা করেছেন, তেমনি সিটির রক্ষণে একের পর এক কাউন্টার অ্যাটাক (Counter Attack) শানিয়েছেন।
সিটির অসহায়ত্ব ও গার্ডিওলার স্বীকৃতি ম্যানচেস্টার সিটির হাই-প্রেসিং (High-pressing) ফুটবলকেও এদিন ফিকে করে দিয়েছেন ভালভার্দে। খোদ সিটি বস পেপ গার্ডিওলা ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় (Man of the Match) হওয়ার যোগ্য দাবিদার ছিলেন ভালভার্দেই। তাঁর গতি এবং দূরপাল্লার শটগুলো সিটি ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আবেগঘন ভালভার্দে ক্যারিয়ারের স্মরণীয় এই রাত শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভালভার্দে নিজেও। তিনি বলেন, “একজন ফুটবলার হিসেবে এমন রাতের স্বপ্নই আমরা দেখি। অনেক দিন পর পূর্ণ আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেললাম। এই জয় সমর্থকদের জন্য।”
এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেল রিয়াল মাদ্রিদ। দ্বিতীয় লেগে সিটির ঘরের মাঠ ইতিহাদ স্টেডিয়ামে নামার আগে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধান আরবেলোয়ার শিষ্যদের দেবে অসামান্য মানসিক শক্তি।