• জাতীয়
  • মানবিকতার চরম অবক্ষয়: স্ত্রীর মৃত্যু ঠেকানোর বদলে ভিডিও ধারণ করলেন পাষণ্ড স্বামী, চট্টগ্রামে গ্রেফতার

মানবিকতার চরম অবক্ষয়: স্ত্রীর মৃত্যু ঠেকানোর বদলে ভিডিও ধারণ করলেন পাষণ্ড স্বামী, চট্টগ্রামে গ্রেফতার

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
মানবিকতার চরম অবক্ষয়: স্ত্রীর মৃত্যু ঠেকানোর বদলে ভিডিও ধারণ করলেন পাষণ্ড স্বামী, চট্টগ্রামে গ্রেফতার

আনোয়ারা উপজেলায় স্বর্ণ বন্ধক নিয়ে বিবাদের জেরে গৃহবধূর আত্মহত্যা; উদ্ধারের পর স্মার্টফোন থেকে মিলল শিউরে ওঠার মতো ভিডিও প্রমাণ।

মানবিক মূল্যবোধের এক চরম অবক্ষয়ের সাক্ষী হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা। যেখানে জীবনসঙ্গিনীকে বিপদে আগলে রাখার কথা, সেখানে নিজের স্ত্রীর আত্মহত্যার মুহূর্তকে লেন্সবন্দি করার মতো বীভৎস ও পাষণ্ড আচরণের অভিযোগ উঠেছে এক স্বামীর বিরুদ্ধে। গত রোববার (২৯ মার্চ) উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ গ্রামে সংঘটিত এই ঘটনায় নিহতের স্বামী মো. ওমর ফারুককে (৩০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, স্ত্রী যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখন তাকে বাঁচানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে পুরো ঘটনাটি নিজের স্মার্টফোনে (Smartphone) ভিডিও ধারণ করছিলেন ফারুক।

ঘটনার নেপথ্যে দাম্পত্য কলহ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত জিন্নাত আরা বেগম (২৬) বাঁশখালী উপজেলার জলদি মিয়ার বাজার এলাকার মো. হোসেনের মেয়ে। প্রায় দুই বছর আগে আনোয়ারার তৈলারদ্বীপ গ্রামের ওমর ফারুকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই দম্পতির আট মাস বয়সী একটি দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণ বন্ধক রাখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। জিন্নাত আরা বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে ফেরার পর থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে সংসারে অশান্তি চরম আকার ধারণ করেছিল।

পাষণ্ড স্বামীর বীভৎস আচরণ

রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জিন্নাত আরা নিজ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। ক্ষোভ ও অভিমানে তিনি আত্মহত্যার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এক রোমহর্ষক তথ্য। জিন্নাত আরা যখন আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছিলেন, তখন স্বামী ওমর ফারুক ঘরের বাইরে ছিলেন। তিনি চাইলে জানালা ভেঙে বা দরজা ভেঙে স্ত্রীকে বাঁচাতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। উল্টো জানালার ফাঁক দিয়ে নিজের মোবাইলে স্ত্রীর সেই করুণ মৃত্যু দৃশ্য ‘ভিডিও ক্লিপ’ (Video Clip) হিসেবে ধারণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে সেই হৃদয়বিদারক ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) ছড়িয়ে পড়লে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

পুলিশি তদন্ত ও শিউরে ওঠার মতো তথ্য

ঘটনার খবর পেয়ে আনোয়ারা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন হিসেবে স্বামী ওমর ফারুককে আটক করা হয়। পুলিশ তার মোবাইল ফোনটি জব্দ করার পর সেখানে আত্মহত্যার সেই শিউরে ওঠার মতো ভিডিওর সত্যতা পায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফারুক স্বীকার করেছেন যে, তিনি স্ত্রীকে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে ভিডিও ধারণ করছিলেন।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মহত্যার দৃশ্য ভিডিও করার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। এটি কেবল অমানবিক নয়, বরং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার দেখিয়েছি এবং সোমবার আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”

আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ভিডিওটি অপরাধের একটি অকাট্য ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ (Digital Evidence) হিসেবে কাজ করবে। একজন স্বামীর এমন নিস্পৃহ ও নিষ্ঠুর আচরণে স্তম্ভিত পুরো চট্টগ্রাম। নিহতের পরিবার এই ঘটনায় ‘লিগ্যাল অ্যাকশন’ (Legal Action) হিসেবে হত্যা প্ররোচনার মামলা দায়ের করেছে। আট মাস বয়সী ছোট্ট শিশুটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরও ঘনীভূত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের অপব্যবহার এবং মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার এটি এক চরম উদাহরণ। যেখানে একজন মানুষ বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধার করা নৈতিক দায়িত্ব, সেখানে নিজের স্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে এমন ‘কন্টেন্ট’ তৈরির মানসিকতা সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

Tags: police action social media human rights domestic violence chittagong crime anwara news suicide video husband arrested housewife death digital evidence