• জাতীয়
  • নারীদের ‘অদৃশ্য যন্ত্রণা’ এন্ডোমেট্রিওসিস: দেরিতে শনাক্তে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি, চট্টগ্রামে ওজিএসবির উদ্বেগ

নারীদের ‘অদৃশ্য যন্ত্রণা’ এন্ডোমেট্রিওসিস: দেরিতে শনাক্তে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি, চট্টগ্রামে ওজিএসবির উদ্বেগ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
নারীদের ‘অদৃশ্য যন্ত্রণা’ এন্ডোমেট্রিওসিস: দেরিতে শনাক্তে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি, চট্টগ্রামে ওজিএসবির উদ্বেগ

সচেতনতার অভাবে তিলে তিলে নষ্ট হচ্ছে নারীস্বাস্থ্য; সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্বারোপ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।

চট্টগ্রামে নারীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘস্থায়ী তলপেটের ব্যথা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব এবং বন্ধ্যাত্বের মতো জটিলতায় নীরবে ভুগছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis) ও অ্যাডেনোমায়োসিস (Adenomyosis)। তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক সংকোচের কারণে এই রোগগুলো শনাক্ত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে, যা নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সোমবার (৩০ মার্চ) বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি অভিজাত হোটেলে ‘অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’ (OGSB) চট্টগ্রাম শাখা আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে আসে। ‘বিশ্ব এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— ‘এন্ডোমেট্রিওসিস সেবায় আমরা কতটা প্রস্তুত?’। একই সঙ্গে সংগঠনটির ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভাও (AGM) এদিন অনুষ্ঠিত হয়।

‘নীরব বোঝা’ যখন এন্ডোমেট্রিওসিস

সেমিনারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এন্ডোমেট্রিওসিসকে একটি ‘সাইলেন্ট বার্ডেন’ (Silent Burden) বা নীরব বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা জানান, এই রোগে জরায়ুর বাইরের টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, যা তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। ওজিএসবি চট্টগ্রাম শাখার বিদায়ী সভাপতি অধ্যাপক ডা. কামরুন নেসা রুনা বলেন, “এন্ডোমেট্রিওসিস কেবল একটি শারীরিক অসুখ নয়; এটি নারীর জীবনমান (Life Quality) এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক নারী বছরের পর বছর এই অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকেন, কিন্তু সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়ায় তারা উপযুক্ত চিকিৎসা পান না।”

শনাক্তকরণে দীর্ঘসূত্রতা ও বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি

সেমিনারে জানানো হয়, এন্ডোমেট্রিওসিস ও অ্যাডেনোমায়োসিস সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে তা বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটি (Infertility) এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওজিএসবির কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, “নারীদের এই ধরনের রোগ নিয়ে লজ্জা বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও এই সংবেদনশীল বিষয়ে আরও দক্ষ এবং ধৈর্যশীল হয়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসায় আধুনিক ল্যাপ্রোস্কোপিক সার্জারি এবং হরমোনাল থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। তবে এর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হওয়া জরুরি। সেমিনারে ঢাকা থেকে আগত প্রথিতযশা গাইনোকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম এবং অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগমসহ অনেকে তাদের মূল্যবান গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

নতুন নেতৃত্বে ওজিএসবি চট্টগ্রাম

বৈজ্ঞানিক সেমিনারের পাশাপাশি ওজিএসবি চট্টগ্রাম শাখার ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের জন্য ২৭ সদস্যের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ‘শেভরন ফার্টিলিটি সেন্টার’-এর চেয়ারপার্সন ডা. জিনাত আরা চৌধুরী সভাপতি এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।

নবনির্বাচিত এই কমিটি চট্টগ্রামে নারী স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, চিকিৎসা গবেষণার প্রসার এবং জুনিয়র চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় নবনির্বাচিত সভাপতি ডা. জিনাত আরা চৌধুরী বলেন, “আমরা এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো জটিল রোগগুলো সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করব, যাতে কোনো নারীকেই আর নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়।”

সেমিনারে একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের সৌজন্যে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেশনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খ্যাতনামা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একমত হন যে, এন্ডোমেট্রিওসিস মোকাবিলায় সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি সচেতনতামূলক প্রচারণাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

Tags: endometriosis adenomyosis