প্রকৃতির রহস্যময় চাদরে ঢাকা সুন্দরবনে এখন উৎসবের আমেজ। গাছে গাছে ফুটেছে খলিসা, গরান আর পশুর ফুলের সমারোহ। প্রকৃতির এই 'গোল্ডেন হারভেস্ট' (Golden Harvest) বা মধু সংগ্রহের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মৌয়ালরা। তবে চিরাচরিত বাঘ কিংবা কুমিরের ভয়ের চেয়েও এবার বড় হয়ে দেখা দিয়েছে 'বনদস্যু আতঙ্ক'। গহিন অরণ্যে দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জীবন বাজি রেখে বনে যাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন হাজারো বনজীবী।
মৌসুমের আনুষ্ঠানিক সূচনা ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি
বুধবার (১ এপ্রিল) সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উদ্বোধনের পাশাপাশি মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানেরও সূচনা করবেন প্রতিমন্ত্রী। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের ঘোষণায় মৌয়ালদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, বনের গহিনে দস্যুদের অতীতের নৃশংসতা মনে করে শঙ্কা কাটছে না অনেকেরই।
বাঘের চেয়েও দস্যু ভয়ংকর: মৌয়ালদের বয়ান
সুন্দরবনের চিরচেনা বিপদ হলো হিংস্র বন্যপ্রাণী। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাঘ কিংবা কুমিরের চেয়ে মানুষরূপী দস্যুরাই মৌয়ালদের কাছে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় মৌয়ালদের দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সুন্দরবনের গহিনে বেশ কিছু নতুন দস্যু দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বনজীবীদের অপহরণ করে মোটা অংকের মুক্তিপণ (Ransom) দাবি করছে। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে জুটছে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মৌয়ালরা জানান, আগে বনের ভেতরে দস্যুদের এমন দাপট ছিল না। কিন্তু এখন অনেকেই পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। অনেক মৌয়াল এবার মধু সংগ্রহের ঝুঁকি না নিয়ে লোকালয়ে দিনমজুর খেটে জীবিকা নির্বাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ঋণের বোঝা ও জীবিকার সংকট
মৌয়ালদের এই মধু সংগ্রহের পেছনে থাকে বিশাল এক আর্থিক ঝুঁকি। অধিকাংশ মৌয়াল চড়া সুদে 'দাদন' বা ঋণ নিয়ে বনে যান। যদি বনদস্যুরা কাউকে অপহরণ করে, তবে সেই মুক্তিপণ দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে দস্যুদের হাতে সর্বস্ব হারানো—এই দ্বিবিধ সংকটে সুন্দরবনের মধু শিল্প এখন হুমকির মুখে। মুন্সিগঞ্জের মৌয়াল আক্কাস আলী জানান, গত বছরও তারা ৭ জনের দল নিয়ে বনে গিয়েছিলেন, কিন্তু এবার প্রাণের ভয়ে লোক জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্রমহ্রাসমান মধু উৎপাদন ও মৌয়াল সংখ্যা
বন বিভাগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে একটি উদ্বেগের চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মধু উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে মৌয়ালদের সংখ্যাও। ২০২৪ সালে যেখানে ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে নিয়োজিত ছিলেন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ৫ হাজারে নেমে এসেছে। এবারের দস্যু আতঙ্ক বজায় থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের তৎপরতা ও আগামীর প্রত্যাশা
বন বিভাগ অবশ্য মৌয়ালদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান জানান, মৌয়ালদের সুরক্ষায় বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড (Coast Guard) যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ইন্টেলিজেন্স (Intelligence) কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
সুন্দরবনের এই মধু কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি উপকূলীয় কয়েক হাজার মানুষের 'লাইভলিহুড' (Livelihood) বা জীবনরেখা। বনদস্যুদের সমূলে নির্মূল করে মৌয়ালদের জন্য একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।