চারপাশে নদ-নদী আর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল—প্রকৃতির অকৃপণ দানে পিরোজপুরকে বলা হয় জলের দেশ। অথচ এই পানির জনপদেই এখন এক ফোঁটা সুপেয় পানির জন্য চলছে চরম হাহাকার। গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হতে না হতেই পিরোজপুর পৌর এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র Water Crisis। সংকটের ভয়াবহতা এতটাই যে, দীর্ঘদিনের আবাস ছেড়ে অনেক ভাড়াটিয়া অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সুপেয় পানির এই অভাব এখন কেবল একটি নাগরিক সমস্যা নয়, বরং পিরোজপুরবাসীর যাপিত জীবনের এক বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।
সংকটের ভয়াবহতা ও গণপ্রস্থান
পিরোজপুর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় দুই লাখ মানুষের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বিভীষিকাময়। নিয়ম অনুযায়ী দিনে অন্তত দুবার নির্দিষ্ট সময়ে পানি সরবরাহের কথা থাকলেও, বাস্তবে মিলছে না এক ঘণ্টাও। কখনো কখনো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যে, চাতক পাখির মতো একদিন অন্তর একদিন পানির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফজলুর রহমানের অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে এই সংকটের রূঢ় বাস্তব। তিনি জানান, পানির সংকটের কারণে তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়ারা বেশিদিন টিকতে পারছেন না। ৩টি ঘরের মধ্যে ইতিমধ্যে ২টির ভাড়াটিয়া পানির অভাবে বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। পানির এমন সংকটের ফলে এলাকায় এক ধরনের 'Internal Migration' বা অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
চাহিদার সমীকরণে বিস্তর ফারাক
দেড়শ বছরের পুরনো এই জনপদ ১৯৮৭ সালে জেলার মর্যাদা পেলেও এর নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেন তিমিরেই রয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ১৯৮৩ সালে যে Water Treatment Plant বা পানি শোধনাগারটি স্থাপন করেছিল, তা এখন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভার সইতে পারছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে পিরোজপুর পৌরসভার প্রায় দুই লাখ বাসিন্দার জন্য প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৯ লাখ লিটার সুপেয় পানির চাহিদা রয়েছে। অথচ শোধনাগারটির বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৩ লাখ লিটার। অর্থাৎ চাহিদার তিন ভাগের দুই ভাগই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই বিশাল Gap বা ঘাটতিই শহরবাসীকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়
কেবল উৎপাদন কম হওয়াই নয়, বরং জরাজীর্ণ Infrastructure বা অবকাঠামোও এই সংকটের অন্যতম কারণ। শহরের অধিকাংশ স্থানে পানি সরবরাহের পাইপগুলো ৩০-৪০ বছরের পুরনো এবং সরু। ফলে পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় অনেক গ্রাহকের বাড়িতে পানি পৌঁছায় না। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শোধনাগারের নিজস্ব পুকুর ও উৎসস্থলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে।
পৌরসভার পানি ও পয়োনিষ্কাশন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসানের মতে, শুরুর দিকে গ্রাহক সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০০, যা এখন ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক Consumer-এর চাহিদা মেটাতে বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ও আগামীর পরিকল্পনা
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় পিরোজপুর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ একটি নতুন Water Treatment Plant প্রকল্পের কথা ভাবছে। প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, একটি বড় প্রকল্পের Feasibility Study বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়ন করা দীর্ঘসময়ের ব্যাপার এবং এর জন্য বড় অংকের Budget Allocation বা অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন।
যতদিন না নতুন প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে, ততদিন পিরোজপুরবাসীর এই তৃষ্ণা মেটানোর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নজরে আসছে না। নদীবেষ্টিত এই জনপদে পানির অভাবে মানুষের গৃহত্যাগ আমাদের টেকসই নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোকেই আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।