পারদ যত কমছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আলস্য। শীতের সকালে বাথরুমের চৌকাঠ পেরোলেই যেন গায়ে জ্বর আসে অনেকের। এই কনকনে ঠান্ডায় প্রতিদিন স্নান করা উচিত, নাকি দু-তিন দিন অন্তর জলের সংস্পর্শে যাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো— এই নিয়ে তর্কের শেষ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় আবার একদল দাবি করেন, শীতে স্নান না করলেই নাকি বাড়ে ‘Life Span’ বা আয়ু। এই সব জল্পনা ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে বিজ্ঞানের নিরিখে আসল সত্যটি খোলসা করেছেন কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. অরিন্দম বিশ্বাস।
শীতের স্নান: নিছক অভ্যাস না কি অপরিহার্য প্রয়োজন?
ডা. বিশ্বাসের মতে, আবহাওয়া যেমনই হোক, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা ‘Personal Hygiene’ বজায় রাখতে প্রতিদিন স্নান করা অত্যন্ত জরুরি। শীতে জল এড়িয়ে চললে হিতে বিপরীত হতে পারে। শীতকালে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা কম থাকায় আমাদের ত্বক দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। স্নান করলে শরীরের মৃত কোষ বা ‘Dead Cells’ এবং জমে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার হয়।
তিনি সতর্ক করে জানান, নিয়মিত স্নান না করলে ত্বকে ‘Bacterial Infection’-এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে একজিমা (Eczema) বা সেলুলাইটিস (Cellulitis)-এর মতো জটিল চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। তবে শীতে সাবানের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি। অতিরিক্ত সাবান মাখলে ত্বকের স্বাভাবিক তেল বা ‘Natural Oil’ নষ্ট হয়ে গিয়ে ত্বক আরও খসখসে হয়ে যেতে পারে।
উষ্ণ জল না কি ঠান্ডা জল: কোনটি নিরাপদ?
কনকনে ঠান্ডায় নিজেকে কষ্ট দিয়ে ঠান্ডা জলে স্নান করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন ডা. বিশ্বাস। তার পরামর্শ হলো:
১. জলের তাপমাত্রা: হালকা উষ্ণ বা কুসুম কুসুম গরম জলে স্নান করাই সবচেয়ে শ্রেয়। এটি শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বা ‘Thermal Balance’ বজায় রাখতে সাহায্য করে। ২. সময় নির্বাচন: একদম ভোরে স্নান না করে বেলা বাড়লে স্নান করা ভালো, যখন পরিবেশের তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকে।
স্নান না করলে কি আয়ু বাড়ে? চিকিৎসকের কড়া জবাব
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ‘স্নান না করলে আয়ু বাড়ে’—এমন তত্ত্বকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ডা. বিশ্বাস। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “এই ধরণের দাবির কোনো ‘Scientific Basis’ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।” একইভাবে, স্নান করলে শরীরের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বা ‘Good Bacteria’ ধ্বংস হয়ে যায়— এই যুক্তিকেও তিনি নস্যাৎ করে দিয়েছেন। চিকিৎসকের মতে, স্নান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘Immunity’ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যদি তা সঠিক নিয়মে করা হয়।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা
শিশু ও প্রবীণদের শারীরিক গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আলাদা হয়, তাই তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সাবধানতা প্রয়োজন:
প্রবীণদের জন্য: যাঁদের আর্থরাইটিস বা বাতের ব্যথা আছে, তাদের অবশ্যই হালকা গরম জল ব্যবহার করা উচিত। খুব ভোরে স্নান করলে নিউমোনিয়া (Pneumonia) বা হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি থাকে।
শিশুদের জন্য: ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে রোজ স্নান করানো সবসময় নিরাপদ না-ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে হালকা গরম জলে তোয়ালে ভিজিয়ে ‘Sponge Bath’ বা গা মোছানো বেশি কার্যকরী। তবে যারা নিয়মিত বাইরে খেলাধুলা করে, তাদের ক্ষেত্রে স্নান করানোই ভালো।
সুস্থ থাকতে চিকিৎসকের ৫টি গোল্ডেন টিপস
শীতকালীন সুস্থতা ও ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে ডা. অরিন্দম বিশ্বাস পাঁচটি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন:
১. স্নানের সীমা: শীতে দিনে একবারের বেশি স্নান করবেন না। অতিরিক্ত জল ব্যবহারে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। ২. কেশচর্চায় সাবধানতা: প্রতিদিন মাথায় জল ঢালা বা শ্যাম্পু করা এড়িয়ে চলুন। ভেজা চুলে ঠান্ডা হাওয়া লাগলে দ্রুত সর্দি-কাশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৩. ফ্যানের ব্যবহার: স্নান সেরে ঘর থেকে বেরিয়েই ফ্যান চালানো বা এসির সামনে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ৪. ব্যায়াম ও স্নান: জিম বা ‘Workout’-এর পর ঘাম শুকিয়ে স্নান করা জরুরি, তবে সাবানের ব্যবহার সীমিত রাখুন। ৫. আর্দ্রতা রক্ষা: ত্বকের কোমলতা ধরে রাখতে স্নানের আগে বা পরে ভালো মানের বডি অয়েল বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
সুতরাং, শীতের আলস্য কাটিয়ে শরীর ও মন সতেজ রাখতে সঠিক নিয়মে নিয়মিত স্নান করুন। বৈজ্ঞানিক পরামর্শ মেনে চললে ঠান্ডা যেমন দূরে থাকবে, তেমনই ত্বকও থাকবে উজ্জ্বল ও সুস্থ।