ক্রিকেট মাঠে বোলারদের অ্যাকশন নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে পাকিস্তানি স্পিনার উসমান তারিকের বোলিং স্টাইল এবার এক অনন্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ‘চাকিং’ (Chucking) বা অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের অভিযোগ উঠলেও, বিষয়টি নিয়ে দুই ভারতীয় ক্রিকেটার—রবিচন্দ্রন অশ্বিন এবং শ্রীভৎস গোস্বামীর বিপরীতমুখী অবস্থান এই আলোচনাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
বিতর্কের মূলে সেই ‘থেমে যাওয়া’ অ্যাকশন
উসমান তারিকের বোলিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তার ডেলিভারি দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সামান্য থমকে যাওয়া। বিষয়টি নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তোলেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটার শ্রীভৎস গোস্বামী। ফুটবলের পেনাল্টি কিক নেওয়ার নিয়মের সঙ্গে তুলনা করে তিনি এর তীব্র সমালোচনা করেন।
গোস্বামী তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লেখেন, “ফুটবলে এখন আর খেলোয়াড়দের পেনাল্টি রান-আপে পুরোপুরি থেমে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। তাহলে ক্রিকেটে এটি কীভাবে ঠিক হতে পারে? অ্যাকশন ঠিক থাকতে পারে, কিন্তু বল ডেলিভারির (Delivery) ঠিক আগে হাত ঘোরানোর সময় এভাবে থেমে যাওয়া কি মেনে নেওয়া যায়? এটি ব্যাটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং কোনোভাবেই চলতে দেওয়া উচিত নয়।”
অশ্বিনের পাল্টা যুক্তি: ব্যাটারদের স্বাধীনতা বনাম বোলারদের শৃঙ্খল
শ্রীভৎস গোস্বামীর এই মন্তব্যে সহমত পোষণ করলেও মুদ্রার উল্টো পিঠটি দেখিয়েছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা থিঙ্কট্যাঙ্ক রবিচন্দ্রন অশ্বিন। ক্রিকেটের বিদ্যমান নিয়মে ব্যাটারদের একচেটিয়া সুবিধা এবং বোলারদের ওপর কড়াকড়ির বিষয়টি সামনে আনেন তিনি।
অশ্বিন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, “ফুটবলে এটি নিষিদ্ধ—এই পয়েন্টে আমি একমত। কিন্তু ক্রিকেটের অন্য নিয়মগুলোর কী হবে? একজন ব্যাটার আম্পায়ারকে আগে থেকে না জানিয়েই রিভার্স সুইপ (Reverse Sweep) বা সুইচ-হিট (Switch-hit) খেলতে পারেন। বোলাররা কি হাত পরিবর্তন করার সময় আম্পায়ারকে না জানিয়ে তা করতে পারেন? বোলারদের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকলেও ব্যাটাররা অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় পান। আমাদের উচিত আগে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মগুলো পরিবর্তন করা।”
আইসিসি-র বৈধতা এবং তারিকের ব্যাখ্যা
উসমান তারিককে নিয়ে এই বিতর্ক অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে অজি অলরাউন্ডার ক্যামেরুন গ্রিন তারিকের অ্যাকশন নিয়ে হাস্যরস করেছিলেন। তবে কারিগরিভাবে তারিক এখন পর্যন্ত সুরক্ষিত। গত বছর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) দুই দফায় তার বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা করে তাকে পূর্ণ বৈধতা দিয়েছে।
আইসিসি-র নিয়ম অনুযায়ী, বল ছোঁড়ার সময় বোলারের কনুইয়ের ‘এক্সটেনশন’ (Extension) ১৫ ডিগ্রির বেশি হতে পারবে না। উসমান তারিক এ প্রসঙ্গে আগেই আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, তার কনুইয়ের বিশেষ গঠনটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।
ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব
উসমান তারিক এবং তাকে ঘিরে অশ্বিন-গোস্বামীর এই বিতর্ক আসলে আধুনিক ক্রিকেটের একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে—ক্রিকেট কি দিন দিন কেবল ব্যাটারদের খেলায় পরিণত হচ্ছে? যেখানে একজন বোলার তার ডেলিভারিতে বৈচিত্র্য আনতে গেলে ‘আইনি’ বাধার মুখে পড়েন, সেখানে ব্যাটারদের সুইচ-হিটের মতো কৌশলে কেন কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা লাগে না, সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
ক্রিকেট বোর্ড বা আইসিসি এই ‘স্টপ-স্টার্ট’ অ্যাকশন নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন কোনো আইন আনে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে আপাতত উসমান তারিকের এই ‘মিস্ট্রি স্পিন’ ২২ গজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে।